বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে নেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ নামের একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত, ভাষাগত কাঠামো এবং দুই দেশের বাধ্যবাধকতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এতে বাংলাদেশের বাজারে কিছু খাতে শুল্ক ছাড়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে একই সঙ্গে নীতি-স্বাধীনতার ওপর চাপও বাড়তে পারে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তিটির নাম অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড বা সংক্ষেপে (এআরটি)।বাংলায় এর অর্থ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। ‘রিসিপ্রোকাল’ শব্দটির অর্থ হলো—দুই পক্ষের মধ্যে সমান আদান-প্রদান।
সমতার ভিত্তিতে দেওয়া-নেওয়ার কথা বলা হলেও, ৩২ পৃষ্ঠার এই দলিলটি হাতে নিয়ে একবার পাতা উল্টালেই চোখ কপালে ওঠার মতো অনেক বিষয় সামনে আসে।
দেশে তখন নির্বাচনের হাওয়া।ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই নিঃশব্দে দেশের ভবিষ্যৎকে একটি চুক্তির ভেতরে বেঁধে দিয়ে যাওয়া হয়। যখন দেশের মানুষ বিষয়টি টের পেল, ততক্ষণে যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে।
এই চুক্তির ভেতরের বিষয় বুঝতে হলে আগে একটি সহজ ব্যাকরণ বুঝতে হবে। ইংরেজি আইনি ভাষায় ‘শ্যাল’ মানে বাধ্যতামূলক—অর্থাৎ এটি করতেই হবে।আর ই ‘উইল’ মানে ইচ্ছাধীন—চাইলে করা যাবে, না চাইলে বাধ্যবাধকতা নেই।
৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মোট ১৭৯ বার, আর ‘উইল’ এসেছে মাত্র তিনবার। এখন প্রশ্ন হলো—বাধ্যবাধকতার ভার কার কাঁধে বেশি পড়েছে?
চুক্তির এই ১৭৯টি ‘শ্যাল’-এর মধ্যে বাংলাদেশের ওপর বাধ্যবাধকতা এসেছে ১৩১ বার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ‘শ্যাল’ ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ছয়বার।আ
অর্থাৎ এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১৩১টি ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে শর্ত মানতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য থাকবে মাত্র ছয়টি ক্ষেত্রে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটাই তথাকথিত ‘পারস্পরিক’ চুক্তির আসল চেহারা। তাদের মতে, এটি আসলে কোনো সমতার চুক্তি নয়; বরং একটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দলিলের নমুনা।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, সেই তালিকা এত দীর্ঘ যে পুরোটা বলতে গেলে আলাদা একটি বই হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে—যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মার্কিন গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদন বা কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চাওয়া যাবে না।
এ ছাড়া মার্কিন ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক কর আরোপ করা যাবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় উৎপাদকদের এমন কোনো ভর্তুকি দিতে পারবে না, যেন মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যায়। এমনকি পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি রড কেনার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন ডিসির পছন্দের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।আ
আর যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন বড় বাণিজ্য চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে ওয়াশিংটন ডিসি পুরো এআরটি চুক্তি বাতিল করে আগের শাস্তিমূলক শুল্ক পুনর্বহালের ক্ষমতা রাখবে। অর্থাৎ চুক্তিটিও এক ধরনের শর্তসাপেক্ষ ‘অনুগ্রহ’ হিসেবেই কার্যকর থাকবে।
এত কিছুর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল? মূলত পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য বা কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ। তবে সেটিও নিঃশর্ত নয়। এই সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকেই তুলা, কৃত্রিম তন্তু এবং বিভিন্ন বস্ত্র উপকরণ আমদানি করতে হবে। যত বেশি আমদানি করা হবে, তত বেশি সুবিধা মিলবে। অর্থাৎ সুবিধা পেতে হলেও নির্ভর করতে হবে তাদের ওপরই।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশকে ৭,১৩২টি মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রায় পুরোপুরি তুলে দিতে হবে। এর মধ্যে ৪,৯২২টি পণ্যের ক্ষেত্রে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। ফলে বড় ধরনের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ।
ফলে একদিকে বাংলাদেশকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মেনে চলার চাপ তৈরি হবে। এককথায়, লাভ সামান্য হলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। একই দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে, আরো একটি বড় চুক্তি সই হয়। সেটি হলো বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় চুক্তি করা সরাসরি আইনের লঙ্ঘনের শামিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ মে, চুক্তি অনুযায়ী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আনুষ্ঠানিকভাবে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে।
এসব উড়োজাহাজ কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম উড়োজাহাজটির সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩১ সালের অক্টোবর থেকে।
এরপর ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো বহর হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই চুক্তি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেকের মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, যখন বাংলাদেশ নিজেই অর্থসংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন এত বড় অঙ্কের চুক্তি বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে।
তবে অসম বাণিজ্য চুক্তি বা উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ই মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের একমাত্র সমালোচিত অধ্যায় নয়। তার শাসনামলে এমন এক ব্যর্থতার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা সরাসরি শত শত শিশুর জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষমতায় আসার পর সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার পুরনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ইউনিসেফ আগেই সতর্ক করেছিল—এই পথে গেলে টিকা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর ফল হিসেবে হাম-রুবেলার টিকার মজুদ ফুরিয়ে যায়। সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দিতে হয়, এমনকি একটি কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিলও করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে।
বাকি ৪১ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। আর এর ভয়াবহ পরিণতি দেশ দেখতে শুরু করে ২০২৬ সালে এসে।
মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঁচ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে চার শতাধিক শিশু। ঢাকা সংক্রামক রোগ হাসপাতালে শিশু রোগীতে উপচে পড়ছে। বেড না থাকায় অনেককে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরাসরি সতর্ক করে বলেছে, টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের কয়েক দশকের অর্জন এখন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। আর আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেছেন—শুধু টিকার ঘাটতিই নয়, এই সংকট দেশের গভীরে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবিও উঠেছে। একসময় যে দেশে হাম সংক্রমণ প্রায় বিরল হয়ে গিয়েছিল, সেখানে মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে পরিস্থিতি আবার মহামারির রূপ নিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলছেন সমালোচকরা।
এখন প্রশ্ন উঠছে—ড. ইউনূসের এই দেড় বছরের শাসনে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্জন কী?
সেই প্রশ্নের উত্তর দীর্ঘ করে দেওয়াও কঠিন। কারণ বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই দেড় বছরে উল্লেখ করার মতো বড় কোনো অর্জন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে গেছে, সেই হিসাব দেখেই তারা বিস্মিত হচ্ছেন।
তাদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার জাতির সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কোটি মানুষের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পথে হাঁটতে গিয়ে দেশকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগই তুলছেন সমালোচকরা।
এখন সবার নজর নতুন সরকারের দিকে। তারা এই সংকট থেকে দেশকে কতটা টেনে তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।











































