ছবি : রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত খারগ দ্বীপের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এটিই তাদের প্রধান তেল টার্মিনাল।
উত্তর উপসাগরের এই দ্বীপ ছোট, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানার শামিল।
রবিবার ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের তেল ‘দখল’ করতে চান এবং খার্গ দ্বীপ দখলের কথা ভাবছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনীকে সেখানে কিছুদিন অবস্থান করতে হবে। ১৩ মার্চ ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, মার্কিন বাহিনী দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিহ্ন করেছে, কিন্তু তেল অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে বিরত রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রশাসন দ্বীপটি দখল করার পরিকল্পনা করছে।
এতে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য চাপ দেওয়া যাবে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। কিছুদিন ধরেই মার্কিন বাহিনী একসময় খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে কি না, এ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপ দখল করা হলে শুধু ইরানের তেল রপ্তানিই বন্ধ হয়ে যাবে না, বরং এটি ইরানের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালানোর একটি ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ নেব, হয়তো নেব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তবে এতে আমাদের সেখানে কিছুদিন থাকতে হবে। আমার মনে হয় না তাদের কোনো শক্ত প্রতিরক্ষা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারি।
’ বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েনের জন্য বিস্তারিত প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ট্রিপোলি নেতৃত্বাধীন একটি ইউনিটের অংশ হিসেবে আরো তিন হাজার ৫০০ মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।
যদিও পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস নির্দিষ্ট কোনো সেনা মোতায়েন বা পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে তারা বারবার বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে।
বিবিসির সিকিউরিটি ব্রিফের বিশ্লেষক মাইকী কে বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা হলে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অর্থনৈতিক লাইফলাইন কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে তাদের যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা কমে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা হতে পারে যে দ্বীপটি দখল করে চাপ সৃষ্টি করা যাবে, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে বাধ্য হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিনের মতে, খার্গ দ্বীপ দখলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যদি অভিযান চালায়, তবে সেটি আকারে ছোট হতে পারে, কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ মার্কিন বাহিনীকে নৌযান বা আকাশপথে অবতরণকারী বাহিনীর মাধ্যমে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছাতে হবে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশের বাহিনী ‘মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছে’। তারা ইরানের ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করলে তাদের ওপর ‘আগুনের বৃষ্টি নামানো হবে।’ এর আগে ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যদি যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালায়, তাহলে লাল সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হুমকির মুখে ইরান সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে খার্গ দ্বীপে প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে। সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তেহরান দ্বীপটিতে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে এবং এর আশপাশের পানিতে মাইন পেতে রেখেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
খার্গ দ্বীপ ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
খার্গ দ্বীপ ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৪-২৫ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ। আকারে ছোট হলেও এটি ইরানের জ্বালানি ও অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের একটি। সহজভাবে বললে এর গুরুত্ব কয়েকটি কারণে।
প্রথমত, ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। ইরানের মোট প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপ থেকেই রপ্তানি হয়। ট্যাংকারগুলো উপসাগর দিয়ে ফিরে এসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চীনের দিকে যায়। চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এখানে এনে বড় ট্যাংকারে তোলা হয়।
দ্বিতীয়, ইরানের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ এবং তেল রপ্তানি ইরান সরকারের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। তাই খার্গ দ্বীপকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বলে থাকেন। ইরানি তেল রপ্তানির একটি টার্মিনাল হিসেবে এই দ্বীপটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর আয়ের একটি প্রধান উৎস।
তৃতীয়, বড় তেল ট্যাংকার ভিড়তে পারে। দ্বীপটির আশপাশে গভীর সমুদ্র থাকায় বড় বড় সুপারট্যাংকার সহজে নোঙর করতে পারে। ইরানের অনেক উপকূলে পানি অগভীর হওয়ায় সেখানে বড় জাহাজ ভিড়ানো কঠিন। চতুর্থ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়বে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন দ্বীপটির তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেনি?
দ্বীপটির অবকাঠামো ধ্বংস করার সামরিক পদক্ষেপ ইরানের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর হবে। এর ফলে সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আরো বেড়ে যাবে এবং ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরো জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পরেও ইরানের কাছে তার উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি জাহাজগুলোর ওপর বিপুল সংখ্যক ড্রোন নিক্ষেপ করার সক্ষমতা রয়েছে। এর ফলে হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু আরো বিস্তৃত হতে পারে, যেখানে লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেগুলো লাখো মানুষের জন্য পানীয় জল সরবরাহ করে।









































