ফাইল ছবি : রয়টার্স
গ্রিনল্যান্ড দখলের লক্ষ্যে সামরিক অভিযানসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এরই মধ্যে ডেনমার্ক সতর্ক করেছে, এ ধরনের হামলা ন্যাটোর সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে।
ট্রাম্প প্রথম মেয়াদ থেকেই গ্রিনল্যান্ডের প্রতি তার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। এবার তিনি সামরিকভাবে বা চাপ প্রয়োগ করে হলেও গ্রিনল্যান্ডের দখল চান। তার প্রশাসন দাবি করে, ‘গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অগ্রাধিকার’। যদিও আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ কেন? আর গ্রিনল্যান্ডে সম্ভাব্য আক্রমণ বা দখলচেষ্টা কি ন্যাটোকে ভেঙে ফেলতে পারে?
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব
শত শত বছর ধরে গ্রিনল্যান্ড ড্যানিশ রাজ্যের উপনিবেশ ছিল এবং ১৯৫৩ সালে তা রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। বিংশ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের পূর্ণ অধিকারের স্বীকৃতি দেয়।
২০০৯ সালে এক আইনের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসন প্রসারিত করেছিল ডেনমার্ক। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার অধিকারও স্বীকার করে এবং এই বিকল্পটি গ্রিনল্যান্ডের বেশিরভাগ বাসিন্দার কাছেও সমর্থিত।
গ্রিনল্যান্ড কানাডার উত্তর-পূর্ব উপকূলের বাইরে অবস্থিত এবং এর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা আর্কটিক বৃত্তের মধ্যে পড়েছে। এই অবস্থান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষার জন্য একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গ্রিনল্যান্ড জিআইইউকে গ্যাপের একটি অংশ রক্ষা করে—যার নামকরণ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের প্রথম অক্ষর থেকে—যেখানে ন্যাটো উত্তর আটলান্টিকে রুশ নৌ-চলাচল পর্যবেক্ষণ করে।
গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল মাটির খনিজ পাওয়া যায়, যা কম্পিউটার ও স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ব্যাটারি, সৌর ও বায়ু প্রযুক্তি সব কিছু তৈরিতে প্রয়োজন। এগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে পারবে।যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা সমুদ্রের উপকূলে সম্ভাব্য তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের কথাও শনাক্ত করেছে।
ন্যাটোর কাজ কী?
ন্যাটো বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা মূলত উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী আন্ত সরকারি সামরিক জোট। সহজ কথায়, এটি এমন একটি সমঝোতা যেখানে সদস্য দেশগুলো একে অপরকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত ন্যাটোর মূলনীতি হলো সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়ার প্রধান অংশ) বিস্তার ঠেকাতে এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই জোট গঠন করেছিল।
মার্কিন দখল চেষ্টা কি ন্যাটোর সমাপ্তি ঘটাতে পারে?
ন্যাটো দেশগুলোর চুক্তি অনুযায়ী, হামলা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই অনুচ্ছেদ ৪ সক্রিয় করা হবে। এর অধীনে সব সদস্য দেশ জরুরি বৈঠকে বসবে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে কিভাবে এই সংঘাত থামানো যায় এবং হামলাকারী দেশের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ন্যাটোর মূল ভিত্তি হলো অনুচ্ছেদ ৫, যেখানে বলা হয়েছে, ‘একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা’।
তবে এটি মূলত জোটের বাইরের কোনো শক্তির হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। যদি এক সদস্য অন্য সদস্যকে হামলা করে, সেক্ষেত্রে পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।
তবে ন্যাটো সম্ভবত ওই দেশকে ‘হামলাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং আক্রান্ত দেশকে অনুচ্ছেদ ৫-এর অধীনে সুরক্ষা দেবে। সেক্ষেত্রে বাকি সব দেশ মিলে হামলাকারী সদস্য দেশের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেবে।
যদিও অতীতে ন্যাটো সদস্য গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে কয়েকবার যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসের তৎকালীন সরকারকে হটিয়ে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এর পেছনে সমর্থন ছিল গ্রিসের তৎকালীন সামরিক জান্তার। তাদের লক্ষ্য ছিল সাইপ্রাসকে গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত করা। তবে তুর্কি সাইপ্রিয়টদের নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় তুরস্ক ২০ জুলাই ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে সামরিক অভিযান চালায়।
এ অবস্থায় ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়নি বা তুরস্কের বিপরীতে দাঁড়ায়নি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করে সংঘাত প্রশমন করে।
তবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ কঠিন হতে পারে। কেননা সার্বিক দিক থেকে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জুলিয়ান স্মিথ বিবিসিকে বলেন, এই পরিস্থিতি শুধু ন্যাটোর জন্য অস্তিত্বগত সংকটই নয়, বরং ‘ইইউ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি’ তৈরি করছে।
জুলিয়ান স্মিথ বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের কথা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।’
তিনি আরো বলেন, ‘এর মানে কেবল সংযমের আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। ইউরোপের শীর্ষ শক্তিগুলোর উচিত বিকল্প পরিকল্পনা শুরু করা এবং একই সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো সাহসী ও উদ্ভাবনী ধারণাও বিবেচনায় আনা।’










































