ছবি : রয়টার্স
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি ন্যাটো সদস্য দেশ রোমানিয়ার ভেতরে পৌঁছে গেছে। ইউক্রেন সীমান্তঘেঁষা রোমানিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় গালাতি শহরে একটি ড্রোন শহরের একটি ১০ তলা আবাসিক ভবনে বিস্ফোরিত হওয়ায় দুইজন আহত হন।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে গালাতি এলাকায় রাডারে শুক্রবার রাতে একটি রুশ ড্রোন রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, শহরটির ১০ তলা আবাসিক ভবনটির ছাদের একটি অংশ পুড়ে গেছে।
দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিস্ফোরিত হওয়ায় ওপরের তলার একটি ফ্ল্যাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে এক নারী ও এক শিশু আহত হয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, ঘটনাটি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রভাবশালী নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ ইউরোপীয় নেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, ড্রোনগুলো ভবিষ্যতেও পথভ্রষ্ট হয়ে তাদের দেশে ঢুকে পড়বে এবং জনগণকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না।

ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে প্রথমবারের মতো ন্যাটো সদস্য দেশের হামলায় মানুষ আহত হলো। এতে ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচেছ।কারণ সদস্য দেশগুলো আশঙ্কা করছে যুদ্ধ তাদের দেশের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণ আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক।
রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর ড্যানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর এ মন্তব্য করেন তিনি। রোমানিয়া ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—দুইটিরই সদস্য।
তিনি আরও বলেন, আমরা ন্যাটোর প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

তবে তিনি ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি চালু করার বিষয়ে কিছু বলেননি।
পাশাপাশি তিনি জানান, যেকোনো হুমকি, বিশেষ করে ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করা হবে।
প্রেসিডেন্ট নিকুসর ড্যান জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কনস্টান্টায় থাকা রাশিয়ার কনসুলেট বন্ধ করা হবে এবং সেখানে থাকা কনসালকে বহিষ্কার করা হবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, বুখারেস্টের এই সিদ্ধান্তের জবাবে মস্কো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ন্যাটো কি পদক্ষেপ নেবে?
ইউক্রেনের সঙ্গে ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকা রোমানিয়া জানিয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দানিউব নদীর তীরবর্তী ইউক্রেনীয় বন্দরগুলোতে রাশিয়ার হামলার সময় এখন পর্যন্ত ২৮ বার রুশ ড্রোন তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে।
গালাতি শহরের বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন এভেলিন এ ঘটনাকে “রাশিয়ার আরেকটি উসকানি” বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি না এটি দুর্ঘটনা ছিল। এতবার এমন ঘটনা ঘটেছে যে এটাকে ভুল করে হয়েছে বলা যায় না। আর যদি সত্যিই ভুল হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে তারা যুদ্ধ পরিচালনায় খুবই অদক্ষ। কিন্তু এ বিষয়ে ন্যাটোর কিছু করা দরকার।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে একাধিকবার ন্যাটোর আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর রাতে, যখন ২০টির বেশি রুশ ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোনও বাল্টিক দেশগুলোর আকাশসীমায় পথভ্রষ্ট হয়ে ঢুকে পড়েছে।
রোমানিয়া ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর কাছে অতিরিক্ত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে।
দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের নিচু উচ্চতায় উড়ন্ত বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম রাডার এবং ড্রোন ঠেকানোর বিশেষ ড্রোন প্রয়োজন।
এদিকে ন্যাটোর এক মুখপাত্র শুক্রবার জানিয়েছেন, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন
দক্ষিণ ইউক্রেনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে গালাতির সীমান্তের ওপারে ওদেসা অঞ্চলের ইজমাইল বন্দরে ড্রোন হামলা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, প্রয়োজন হলে রোমানিয়াকে যেকোনোভাবে সহায়তা দিতে প্রস্তুত কিয়েভ।

রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার পরিস্থিতি নজরদারিতে দুটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও একটি সামরিক হেলিকপ্টার পাঠানো হয়। হামলার সময় পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে আগেই পাইলটদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যাতে জনবসতিপূর্ণ এলাকার ক্ষতি না করে সুযোগ পেলে ড্রোন ভূপাতিত করতে পারে।
রোমানিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ঘেওর্গে ম্যাকসিম জানিয়েছেন, ড্রোনটি চার মিনিট রোমানিয়ার আকাশসীমায় ছিল এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় রাডারে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘মেরপস’ অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা রোমানিয়ায় চালু থাকলেও সেটি এখনো পুরোপুরি দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়নি। এছাড়াও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের মধ্যে সেটি ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতো।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহত নারী ও শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও দুইজন আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসা নেন। ভবনটি থেকে ৭০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জরুরি সেবা সংস্থার দায়িত্বে থাকা উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রায়েদ আরাফাত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিজি২৪-কে জানিয়েছেন, ড্রোনের আঘাতে ভবনের দুটি সিঁড়িপথ, একটি লিফট এবং পাঁচটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত এপ্রিলেও গালাতিতে একটি ড্রোন বিদ্যুতের খুঁটি ও একটি বাড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।










































