আইভিএফ জটিলতায় যমজ সন্তানের পরিচয় ঘিরে চাঞ্চল্য দিল্লিতে

সংগৃহীত ছবি

ভারতের দিল্লিতে আইভিএফ চিকিৎসা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। রাহুল রাঠোর (৪১) ও তার স্ত্রী মীনু (৩৯) বহুদিন ধরে আরেকটি সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন।তাদের আগে থেকেই দুই কন্যাসন্তান ছিল। বয়স বাড়ার কারণে ২০২৪ সালের শেষ দিকে তারা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মীনু যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু জন্মের কিছুদিন পর থেকেই দম্পতির মনে সন্দেহ তৈরি হয়।তাদের দাবি, শিশু দুটির চেহারায় বাবা-মায়ের কারও সঙ্গে কোনো মিল নেই। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় চমকপ্রদ তথ্য আসে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, যমজ দুই শিশুই জৈবিকভাবে রাহুল বা মীনুর কারোই সন্তান নয়। এমনকি শিশু দুটির মধ্যেও কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করা হয় রিপোর্টে।

ভুক্তভোগী দম্পতি অভিযোগ করেন, দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ এলাকার এসসিআই আইভিএফ ক্লিনিকে ভ্রূণ অদলবদল হয়েছে বা গুরুতর কোনো অনিয়ম ঘটেছে। তবে হাসপাতাল এই অভিযোগ অস্বীকার করে। হাসপাতালের দাবি, দম্পতির নিজস্ব জিনগত উপাদান চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাই তাদের সম্মতিতেই অজ্ঞাতনামা দাতার ভ্রূণ ব্যবহার করা হয়। তবে এই দাবি মানতে নারাজ রাহুল-মীনু।মীনু বলেন, যে সম্মতিপত্র দেখানো হচ্ছে, সেই সময় তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন। রাহুল বলেন, গত পাঁচ মাস ধরে তিনি সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সম্মতিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হওয়ার কথা। কিন্তু সেই কাগজে নোটারিও করা হয়নি। 

দম্পতির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ একজন আইভিএফ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেখান থেকেই তারা দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ এলাকার এসসিআই আইভিএফ হাসপাতালের কাছে যান। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। তিন মাস পর, ওই বছরেরই ১৪ মে চিকিৎসক দল তাদের সুখবর দেয়। পাঁচটি সুস্থ ভ্রূণ সফলভাবে তৈরি হয়েছে। সেদিনই সেই পাঁচটির মধ্যে তিনটি ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হয়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি দ্বারকার একটি হাসপাতালে মীনু যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়। 

রাহুল পরে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে চান, কিন্তু ক্লিনিক প্রথমে আপত্তি জানায়। পরে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি তারা দুটি ভিন্ন ডিএনএ পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে নমুনা পাঠান।। জানুয়ারি মাসের ১০ ও ১৪ তারিখ পরীক্ষার ফল আসে। রিপোর্টে বলা হয়, শিশু দুটির জৈবিক বাবা-মা রাহুল ও মীনু কেউ নন।

১৭ জানুয়ারি দম্পতি পুলিশের কাছে যান। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মার্চ মাসে তারা আদালতের দ্বারস্থ হন। ২৩ মার্চ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবাংশী জানমেজা বিষয়টিকে গুরুতর বলে মন্তব্য করে ক্লিনিকের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দেন। আদেশে বিচারক বলেন, নথিপত্রের সব তথ্য ও পরিস্থিতি একত্রে বিবেচনা করলে গুরুতর ও ভয়াবহ শাস্তিযোগ্য অপরাধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এর মধ্যে শুধু জালিয়াতি বা আইভিএফের নিয়ম ভঙ্গই নয়, শিশু পাচার ও অপহরণের ষড়যন্ত্রের বিষয়ও থাকতে পারে। অভিযোগকারীদের আসল সন্তানদের অপহরণ বা পাচার করার মত সম্ভবনাও এই পর্যায়ে নাকচ করা যাচ্ছে না। তাই বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।
   
৩০ মার্চ আদালত আবারও পুলিশকে দ্রুত এফআইআর করে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দেয় এবং সব নথি সংরক্ষণের আদেশ দেয়। এরপর হাসপাতাল রিভিউ পিটিশন দাখিল করলেও তা পরে খারিজ হয়ে যায়। ৫ জুন আদালত জানায়, হাসপাতালের নথিতে অনিয়মের ইঙ্গিত রয়েছে। তাই পুরো বিষয়টি পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। বিচারক আরও বলেন, এই ধরনের জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাসপাতালের কাছেই থাকে। তাই তাদের নথি যাচাই ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।

দম্পতির অভিযোগ, তারা সত্য জানার জন্য বারবার চেষ্টা করলেও কোনো সঠিক উত্তর পাচ্ছেন না। রাহুল বলেন, গত কয়েক মাস ধরে তিনি কাজেও যেতে পারিনি। তারা শুধু জানতে চান আসলে কী হয়েছে। মীনু বলেন, শিশু দুটির বয়স এখন পাঁচ মাস। তাদের কাছে সব নথি আছে, তবুও কেউ তাদের কথা শুনছে না। তারা অভিযোগ করেন, পুরো আইভিএফ খাতে লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, রোগীর অনুভূতিকে নয়।

সব বিতর্কের মধ্যেও রাহুল ও মীনু শিশু দুটিকে নিজেদের কাছেই রেখেছেন। তারা শিশু দুটির নাম দিয়েছেন চিকু ও স্ট্রবেরি। রাহুল বলেন, শিশু দুটি তার কাছে তারই মেয়ে। সত্য যাই হোক, তিনি তাদের বড় করবেন।
 
বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ সব নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করছে।
 

LEAVE A REPLY