প্রতীকী ছবি
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পেয়েছিল, যা দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার ভারে জর্জরিত ছিল। জুলাই অভ্যুত্থান থেকে অর্জিত নৈতিক বৈধতার ভিত্তিতে গঠিত নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের তত্ত্বাবধান নয়।বরং জনগণ আশা করেছিল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু করবে সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সেই সময়কার শাসনের ওপর সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এবং বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন এসেছে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নয়, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর কাছ থেকে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত তাদের ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড সার্ভে ২০২৫’-এ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংঘটিত দুর্নীতির ওপর একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ওই জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সরকারি সেবাখাতগুলোতে সেবা পেতে নাগরিকদের মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি।
আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় ছিল দুর্নীতির ব্যাপকতা। জরিপে দেখা যায়, অন্তত একটি সেবাখাতে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যেখানে আগে এই হার ছিল ৭০.৯ শতাংশ। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫০.৮ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় ছিল, দুর্নীতির শিকার ৬১.৩ শতাংশ মানুষ কোনো অভিযোগই করেননি।কেননা তাদের মনে হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে থাকা প্রশাসনের পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্নীতিগ্রস্ত। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলো ছিল পাসপোর্ট সেবা, বিচার বিভাগীয় সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি প্রশাসন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ওই সময় বলেছিলেন, ‘ঘুষ এখন ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। যারা ঘুষ দিয়েছেন, তাদের ৮১.৫ শতাংশের বক্তব্য ছিল—সেবা পেতে হলে ঘুষ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’ সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের পরিবার, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিআইবি এই ফলাফলকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার শাসনব্যবস্থার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং ভবিষ্যতে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ মূল্যায়নের জন্য এই জরিপকে একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। যে সরকার ঠিক এর বিপরীত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি ব্যাপার।
২০২৪-এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দুর্নীতি দূর হয়নি। টিআইবির পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই ধারণাকে আরও জোরালো করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক সংস্কৃতি অনেক বেশি স্থায়ী ও শক্তিশালী ছিল। নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘কিছুই বদলায়নি।’ তিনি বলেন, আগে যারা ঘুষ নিত, তারা এখনও বিভিন্নভাবে তা নেওয়ার পথ খুঁজছে; আর যারা সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করত, তারা এখনও সেই একই অবস্থানে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেকের শুধু ‘চেহারা বদলেছে’ আর এখন নিজেদের ‘সবচেয়ে বড় জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। এসব কথা—রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি অনেক সময় যে আগের মতোই থেকে যায়; সেই বৃহত্তর বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
তাঁর মন্তব্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে। সেটা হলো, সরকারগুলো আমলাতন্ত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের মূল্যায়ন হয় সেই আমলাতন্ত্রে পরিবর্তন আনতে তারা কতটা সফল হয়েছে, তার ভিত্তিতে। সেই বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড মোটেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে থাকা ছাত্র প্রতিনিধিদের কার্যক্রমও জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি করেছে।
জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতারা এমন একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিলেন, যেই প্রজন্ম রাজনীতিতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং পৃষ্ঠপোষকানির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছিল। তাই, প্রচলিত রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির বাইরে থেকে অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্তি জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেনি।
‘প্রথম আলো’র এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ছাত্র উপদেষ্টারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তাঁদের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ঘিরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও উঠেছে। তাঁদের নিয়ে বিতর্ক তীব্র হওয়ার পরও তাঁদের পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাঁদের ক্ষমতায় থেকে যাওয়া জনজীবনে নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের ক্ষেত্রে যথাযথ বার্তা দেয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কর্মকাণ্ড তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ, তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে অন্যান্য পক্ষের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোতে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আগের পদ্ধতি অব্যাহত রাখার অভিযোগ ওঠে। আসিফ মাহমুদ অবশ্য এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেছিলেন বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর সাবেক এপিএসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন। এসব বিতর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল সংস্কার ও নতুন নৈতিক মান প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও একইভাবে সমালোচনার মুখে পড়েন। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং নিয়োগ ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে। কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রকাশ্যে হতাশা জানিয়ে বলেন, মাহফুজ আলমের মেয়াদে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ এই হতাশাজনক অবস্থার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ছাত্র উপদেষ্টারা প্রত্যাশিত রূপান্তরমূলক সংস্কারকের ভূমিকা নেওয়ার বদলে মূলত প্রচলিত প্রশাসকের ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠন এবং নাগরিকত্বের একটি অভিন্ন বোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে সমাজের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সংঘাতনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করেছে।’
এই ঘটনাপ্রবাহ অনিবার্যভাবেই জুলাই প্রজন্মের ব্যাপারে জনগণের পূর্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল আত্মত্যাগ, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং নতুন আশার প্রতীক হিসেবে, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, নিয়োগ ও পদ বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো পুরাতন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ম্লান হয়েছে। ন্যায্য হোক বা অন্যায্য, অনেক সমালোচকেরই মত ছিল, আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে নির্বাহী ক্ষমতার আসনে পৌঁছানোর এই রূপান্তর প্রত্যাশার তুলনায় খুব কম ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
তবে এই ঘটনা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই পাওয়া গিয়েছিল, এমন না। অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকেরা প্রায়ই যুক্তি দেন, তারা এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন যেখানে দুর্নীতির শিকড় ছিল গভীর এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো সরকারের পক্ষেই রাতারাতি সেই কাঠামো একেবারে ভেঙে ফেলা বাস্তবসম্মত ছিল না। কিন্তু তারপরও, একদিকে বিপুল জন-আকাঙ্ক্ষা এবং অপরদিকে দুর্নীতির বিভিন্ন সূচকে দৃশ্যমান অবনতির যুগপৎ উপস্থিতি এই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর বিষয় হয়েই থাকছে। সেই উত্তরাধিকার এখন বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্যও নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
একেবারে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি থেকে যাত্রা শুরু করার বদলে, সরকারকে এমন একটি আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা টিআইবির জরিপ এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সংস্কারের প্রতি অনাগ্রহী ও প্রতিরোধী বলে মনে হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারও আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বা ‘নতুন ব্যবস্থা’র প্রতিশ্রুতির পরও বাস্তবে বহু পুরোনো চর্চা ও অভ্যাস বহাল রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে টিআইবির সেই সুপারিশগুলো অবিলম্বে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, যে সুপারিশমালার ভেতরে রয়েছে সরকারি সেবার দ্রুত ডিজিটালাইজেশন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক সম্পদ বিবরণী দাখিল, সমন্বিত দুর্নীতিবিরোধী কৌশল এবং আইনের আরও কার্যকর প্রয়োগ। এই জরিপকে শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি সতর্ক করছে যে, বাংলাদেশের দুর্নীতির সমস্যা মূলত কাঠামোগত সমস্যা এবং সেটি গভীরভাবে কাঠামোর ভেতরে প্রোথিত।
জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো, সেই নৈতিক শক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপদান করা।
ইতিহাস হয়তো শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে তাদের ঘোষিত আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং তারা যে সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেনি, তার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করবে। এখন, নির্বাচিত সরকারের এটা প্রমাণ করা দায়িত্ব যে, রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্যিই প্রশাসনিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারে। যদি সেই সুযোগও পুনরায় হাতছাড়া হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার নয়; বরং বাংলাদেশের মানুষ। দেশের শাসনব্যবস্থা অতীতের পুরোনো অভ্যাস ও সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে—এই বিশ্বাস তারা হারিয়ে ফেলতে পারে।









































