হরমুজ না খুললে ইরানকে ‘কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে : ট্রাম্প

ছবি : রয়টার্স

আপসের আশা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।তা না হলে ইরানকে ‘খুব কঠিন আঘাত’ করা হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে আবারও জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে। এরপরই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।সরবরাহে বাধা কমতে পারে—এমন খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ পাউন্ডের নিচে নেমেছে। তবে গত কয়েক মাসে আগের আলোচনাগুলো সংঘাত কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানির দামে।বেশি দাম গুনতে হয়েছে গাড়িচালকদের।

ক্যালিফোর্নিয়া সফরের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, কয়েক মাসের সংঘাত শেষ করতে ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ দিকের পথ আন্তর্জাতিক এই জলপথ ব্যবহার করতে চাওয়া সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এখনো মুক্ত ও উন্মুক্ত রয়েছে।’ মঙ্গলবার ব্রেন্ট তেলের দামের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দামও ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে নেমে আসে।দুই ধরনের তেলের দামই ১৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।

রুবিও বলেন, ইরান ও ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরো বেশি জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার আলোচনা এগিয়েছে। তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই সেটি হবে।’ বেসেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যেই একটি চুক্তি হতে পারে। তিনি সিএনবিসিকে বলেন, ‘আজ অথবা আগামীকাল আমাদের একটি চুক্তি হতে পারে। এতে প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং এই সংঘাত আরো স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগোবে।’ ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের কাছ থেকে অর্থ নিতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি হবে চলাচলের স্বাধীনতা।’

মার্কিন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনা এগোচ্ছে। তবে সম্ভাব্য চুক্তিটি কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে না। এমন কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই। তারা ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছে, যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান বের করতে তারা অন্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই বলেও তারা স্বীকার করেছে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘ পাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের প্রায় সবই ব্যবহার করে ফেলেছে। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জানা দুটি সূত্র বিবিসির মার্কিন সংবাদ সহযোগী সিবিএস নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্বে প্রতিদিন সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেশির ভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি করেছে।

এদিকে ২০ জুলাই থেকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপরও অবরোধ আরোপ করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর এই পথটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছিল। কিন্তু গত এক সপ্তাহে একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনার কারণে পথটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার ইয়েমেনের জলসীমার কাছে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবে যায় বলে ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জাহাজে থাকা ১৪ জনকেই উদ্ধার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজের ওপর হুমকি এখন সবচেয়ে বেশি।

এজে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা খুব ভালোভাবেই জানেন, এই যুদ্ধের সময় আমরা এর আগে বহুবার এমন অবস্থায় এসেছি। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কতটা নাজুক, সেটিও তারা জানেন।’ এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাম্পে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে প্রতি লিটার পেট্রলের গড় দাম এখন ১ দশমিক ৬০ পাউন্ডে পৌঁছেছে। আরএসি মোটরিং গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এটি সংঘাত শুরুর সময়কার দামের সমান। যুক্তরাষ্ট্রে এএএর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি। ডিজেলের দাম প্রায় ৫ দশমিক ৪০ ডলার প্রতি গ্যালন।

সংঘাত তীব্র হলে তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। আবার আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললে আগেও দাম দ্রুত কমেছে। উচ্চ তেলের দামের কারণে বিপি, শেল, শেভরন ও এক্সন মবিলের মতো বড় তেল কম্পানিগুলো রেকর্ড মুনাফার খবর দিয়েছে। তবে হিউসন বলেন, এত বড় আয় হলেও তেল কম্পানিগুলো এখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘চালচলন ও সিদ্ধান্তের’ ওপর নির্ভরশীল। সোমবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করতে চুক্তিতে রাজি হওয়ার জন্য ইরানের সামনে এটিই ‘শেষ সুযোগ’। তিনি বলেন, আলোচনা আবার শুরু করার জন্য তিনি ইরানের ওপর চালানোর পরিকল্পনা করা ‘বড় ধরনের’ হামলা স্থগিত করেছেন।

মঙ্গলবার তেলের দাম কমার খবরে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত করপোরেট ফলাফল প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বড় প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যয় আরো বাড়বে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল।

LEAVE A REPLY