‘ভিনি জুনিয়র যে ভালো খেলেন’ — তথ্যটা আপনি আগেও জানতেন। ব্যালন ডি’অরের আলাপে যিনি আছেন শেষ মৌসুম তিন ধরে, তিনি আর যাই হোক খারাপ খেলবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। এই তথ্য যেমন স্বস্তির, তার উল্টোপিঠে আছে সে তথ্য খানিকটা অস্বস্তিরই ছিল, অন্তত ১ বছর আগেও।
একজন খেলোয়াড় যখন প্রতিভাবান, তখন আমরা ধরে নিই বাকিটা বুঝি সময়ের ব্যাপার। ভিনির ক্ষেত্রে আমরা প্রায় সেই জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তো সব অঙ্কের হিসেবে মিলে যায় না! ফুটবলে এমন সব গল্প ঠিক কতবার পড়েছেন আপনি? অগুণতিবার নয় কি?
রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে যে ছেলেটা বার্সাকে স্তব্ধ করে দেয় দুরন্ত হ্যাটট্রিকে, যে ছেলেটা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করে, ব্রাজিলের জার্সি গায়ে উঠলেই কেন যেন তার পা দুটো অচেনা হয়ে যেত। কোচ বদলায়, সিস্টেম বদলায়, প্রত্যাশা পাহাড়ের মতো বাড়ে; কিন্তু সংখ্যাটা এগোয় শ্লথ গতিতে।
৩৯ ম্যাচে ১১ গোল-অ্যাসিস্ট। গড়ে ০.২৮। এই সংখ্যা আর যাই হোক, ভিনিসুলভ নয় আদৌ। এই সংখ্যার আড়ালে যে হতাশা, সেটা পরিসংখ্যানে লেখা থাকে না। থাকে ভিনির মুখের সেই চাপা অস্বস্তিতে, যেটা ক্যামেরা মাঝে মাঝে ধরে ফেলত। ক্লাবে তিনি প্রমাণিত সেনানী, কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে সে প্রমাণটা দিতে না পারার ব্যর্থতা যতটা না হতাশার, তার চেয়েও বেশি চাপের।
ঠিক তখনই যেন ত্রাতা হয়ে এলেন আনচেলত্তি। ক্লাবে তার সঙ্গে সখ্যতা ছিল বেশ। তার অধীনে সাফল্যও আছে অগুণতি। ভিনির যে আজকের ভিনি হয়ে ওঠা, সেটাও তার হাত ধরেই। সেই আনচেলত্তি যখন চলে আসবেন তার জাতীয় দলের ডাগআউটে, তখন সেটা টনিক হিসেবে কাজ করতোই!
সেটা করলোও। আনচেলত্তির অধীনে ১২ ম্যাচে নয়টি গোলে সরাসরি অবদান। পাঁচ গোল, চার অ্যাসিস্ট। গড়টা যেখানে .৩ এরও নিচে ছিল, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৭৫-এ। রীতিমতো ১৬৭ শতাংশ উন্নতি! বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে কিংবদন্তি রোনালদিনিওর সমান অবদান এখন ভিনির নামের পাশে—তিন গোল, তিন অ্যাসিস্ট। এইতো আজও যেমন, হাইতির বিপক্ষে গোল করলেন, করালেন; দলকে এনে দিলেন বিশ্বকাপের প্রথম জয়টা।
এর পেছনে আসল গল্পটা সংখ্যার নয়। গল্পটা আস্থার। আনচেলত্তি কী এমন জাদু জানেন, যা তিতে বা অন্য কেউ জানতেন না? হয়তো জাদু নয়, বরং তার উল্টোটা—একটা শান্ত, প্রায় নিরাসক্ত বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের জোরে কেউ ‘তুমি পারবে’ বলে না, বরং ধরেই নেয় ‘তুমি পারবে’; আর তোমাকে শুধু জায়গাটা করে দেয়। ম্যাচ শেষে ভিনি নিজেই যেন সেই কথাটা বলে গেলেন, কিছুটা দ্বিধা নিয়ে, কিছুটা স্বস্তি নিয়ে, ‘আমি জানি আমার গুরুত্ব কতটা। আমি যদি ভালো খেলি, জানি কতটা অবদান রাখতে পারি।’
এই লাইনটায় থামুন একটু। এটা অহংকারের কথা নয় আদৌ। এটা একজন মানুষের কথা, যে অবশেষে নিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন।
আমরা যারা টিভির সামনে বসে রিমোট হাতে চিৎকার করি, আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, একজন খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মাঠের প্রতিপক্ষ না। ‘আমি কি যথেষ্ট?’ – নিজের মধ্যে জমে থাকা এই প্রশ্নটা।
২০২২ বিশ্বকাপে চার ম্যাচে এক গোল, দুই অ্যাসিস্ট নিয়ে যে ছেলেটা মাঠ ছেড়েছিল, তার মনেও নিশ্চয়ই প্রশ্নটা ঘুরছিল।
সে প্রশ্নের জবাব ভিনি আগেও দিয়েছেন। সেটা রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পরবর্তী যুগেও রিয়াল ২টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে, তাতে বড় অবদান আছে তার, মাথার ওপরে ছিল আনচেলত্তির আস্থার হাত। এবার কার্লো যখন ডাগআউটে, ভিনি ব্রাজিলের জার্সিতেও সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। গোলে, অ্যাসিস্টে, আর সেই নিরুত্তাপ আত্মবিশ্বাসে।
বুধবার মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নামবে ব্রাজিল। গ্রুপ সি-তে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট নির্ধারণ হবে সেই ম্যাচে। ভিনির জন্য এটা আরেকটা পরীক্ষা, আরেকটা সুযোগ নিজেকে নতুন করে চেনানোর।
তবে যা ঘটে গেছে, তা আর মুছবে না। ভিনি জুনিয়র যে ভালো খেলেন, এটা নতুন কোনো খবর না। তবে এবার তিনি যেভাবে খেলছেন, সেটা নতুন। আর সে নতুনই ব্রাজিলকে দেখাচ্ছে পুরোনো এক স্বপ্ন। হেক্সার স্বপ্ন, বিশ্বকাপের স্বপ্ন। সে স্বপ্নের নিউক্লিয়াস এই বদলে যাওয়া ভিনিই।










































