দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার দাবি আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি সার্ককে সক্রিয় করার আহ্বান জানিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু।এর আগে একই দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশের নতুন সরকারও। তবে এ নিয়ে আলোচনা ঘুরেফিরে দুই দেশের কাছেই এসে আটকে যায়। আর অঘোষিত প্রশ্নও থেকে যায় দুটি—ভারত কি এতে সম্মতি দেবে, আর পাকিস্তান কি তা হতে দেবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের সমাধান না হলে সার্ক পুনরায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সার্ক জটিলতা
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সার্ক প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমতার কথা বলা হলেও বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ভারতের।ফলে সংস্থাটির কার্যক্রম অনেকাংশে নির্ভর করে ভারতের অবস্থানের ওপর।
সার্কে সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করতে হয়। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে জম্মু ও কাশ্মীরের উরি শহরে জঙ্গি হামলা পর সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেয় ভারত।পরে বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানও অংশ না নেওয়ায় সম্মেলন বাতিল হয়। এরপর আর কোনো সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি।
ভারতের অবস্থান
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার সবাই জানে কোন দেশ সার্কের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে। সেখানে সরাসরি দেশের নাম উল্লেখ না করা হলেও দিল্লির বক্তব্যে পাকিস্তানকেই দায়ী করা হয়েছে।
ভারতের কৌশলগত অবস্থানও গত এক দশকে বদলেছে।সার্কের পরিবর্তে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন), বিমসটেক (বিমস্টেক) এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। বিশেষ করে পাকিস্তান সদস্য না থাকায় বিমসটেককে ভারত আরও কার্যকর আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরছে।
পুনরুজ্জীবন চায় ছোট দেশগুলো
মালদ্বীপের জন্য আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে একটি কার্যকর সার্ক। পর্যটননির্ভর দেশটি ভারত ও চীনের প্রভাবের বাইরে একটি বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু নিজেকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা এসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি, দীর্ঘ ১৪ বছর পর সরাসরি ঢাকা-ইসলামাবাদ ফ্লাইট চালু এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা—এসবের মধ্যেই সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও স্বাধীন ভূমিকা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের পাল্টা অবস্থান
ভারত রাজনৈতিক কারণে সার্কের সর্বসম্মতির নীতিকে ব্যবহার করছে বলে দাবি করছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের ইস্যুকে সংগঠন অচল রাখার অজুহাত হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
ইসলামাবাদের মতে, কাশ্মীরসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিরোধও সমাধানের পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালের পর সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ঘটনাগুলোই সার্ক অচল হওয়ার তাৎক্ষণিক কারণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। কারণ, এতে দিল্লি পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বিকল্প আঞ্চলিক জোট ও দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে পারছে।
সার্কের ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্ক পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সব সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় দিল্লি সম্মতি দেওয়ার সম্ভাবনা কম, আর পাকিস্তানের নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
ফলে বাংলাদেশ, মালদ্বীপসহ ছোট সদস্য দেশগুলোর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ভারত-পাকিস্তান বিরোধ অব্যাহত থাকলে সার্কের পুনরুজ্জীবন আপাতত আলোচনার বিষয় হয়েই থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।










































