শারীরিক প্রতিবন্ধী পারভীন আক্তারের আজ খুশির কোনো সীমা নেই। কারণ পলিথিনে মোড়ানো বস্তির মতো ঘর ছেড়ে খুব শিগগিরই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উঠবেন বহুতল আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে।
রিকশাচালক স্বামী মনিরুল আলম ও দুই সন্তানকে নিয়ে এতদিন মানবেতর পরিবেশে বসবাস করলেও এখন তাদের নতুন ঠিকানা হবে কক্সবাজারের খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের একটি আধুনিক আবাসন।
লটারিতে নিজের ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার পর আবেগাপ্লুত পারভীন বলেন, মনে হচ্ছে আমি এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
একই আনন্দ জেলে রেজাউল করিমের পরিবারেও। তিনি বলেন, কোনোদিন কল্পনাও করেননি বহুতল ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবেন। তালিকায় নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি।
পারভীন ও রেজাউলের মতো আরও ৭৩০টি পরিবার এখন নিশ্চিত হয়েছে যে অচিরেই তারা ঝুপড়িঘর ছেড়ে আধুনিক বহুতল আবাসনে উঠবে।
রোববার (২ আগস্ট) কক্সবাজারের খুরুশকুলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারি অনুষ্ঠিত হয়। লটারির মাধ্যমে নতুন জীবনের স্বপ্ন বাস্তবের পথে এগিয়ে গেল শত শত বাস্তুচ্যুত পরিবার।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে সমিতিপাড়া এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ভূমিহীন পরিবারগুলোর নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এ প্রকল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ মানবিক ও জলবায়ু-সহনশীল আবাসন উদ্যোগ। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
চার হাজার ১২৮টি পরিবারকে দেওয়া হবে ফ্ল্যাট
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মোট ৪ হাজার ১২৮টি জলবায়ু উদ্বাস্তু ও বিমানবন্দর সম্প্রসারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারকে এখানে পুনর্বাসন করা হবে। এ লক্ষ্যে ১২৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ভবনের চারটি আবাসিক তলায় ৮টি করে মোট ৩২টি ফ্ল্যাট রয়েছে।
ইতোমধ্যে ১২২টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি সাতটির কাজ শেষ পর্যায়ে। এর আগে ১৯টি ভবনে ৬০০টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। এবার আরও ৭৩০টি পরিবারের জন্য ভবন ও ফ্ল্যাট নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোকেও পর্যায়ক্রমে একই প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন করা হবে।
প্রকল্পের শুরুতে শূন্য বালুচরে নির্মাণকাজে পানির সংস্থান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরে ছনখোলা এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বাকখালী নদী থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি ভবনের নিচতলায় চারটি অতিথিকক্ষ ও দুর্যোগকালীন আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বর্জ্য শোধনাগার, কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড, ফিল্ট্রেশন পন্ড, কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি), ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ব্যবহৃত পানি বাকখালী নদী দূষিত না করে। পাশাপাশি প্রতিটি ভবনে সোলার প্যানেল ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম বসানো হয়েছে। প্রকল্পজুড়ে সবুজায়ন, ল্যান্ডস্কেপিং ও বনায়ন কার্যক্রম চলছে।
নিরাপত্তার জন্য আধুনিক সড়কবাতি, একটি মসজিদ, একটি মন্দির, একটি কমিউনিটি সেন্টার, চারটি সাইক্লোন শেল্টার এবং একটি মার্কেট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে বা হচ্ছে। নদীপথে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে দুটি জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর একটি পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য এবং অন্যটি শুঁটকি মহল এলাকায়, যাতে জেলেরা সরাসরি মাছ এনে শুঁটকি উৎপাদন করতে পারেন। নির্মাণকাজ চলাকালে সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রকল্প পরিদর্শন করেন।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিরাজুল ইসলাম বলেন, গুণগত মান শতভাগ বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। সাধারণ বস্তি বা ঝুপড়িতে বসবাসকারী মানুষকে আন্তর্জাতিক মানের সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন উপহার দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্প নয়, জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জীবনে স্থায়িত্ব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার একটি মানবিক উদ্যোগ। ভবনের পাশাপাশি ড্রেনেজ, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, সোলার প্যানেল ও জেটিসহ যুক্ত সুবিধাগুলো এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, শুরু থেকেই তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় সবার সামনে লটারি পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার পান। আজ ৭৩০ পরিবারের জন্য ভবন ও ফ্ল্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবার এখন নিরাপদ ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা পাবে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর সমন্বিতভাবে তাদের পুনর্বাসনে কাজ করছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, প্রকল্প এলাকায় যেন কোনো ধরনের অপরাধ, মাদক, চুরি, ছিনতাই বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কক্সবাজার জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় এ এলাকাকে একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল আবাসন হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
লটারি অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিউর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।









































