পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ হত্যাযজ্ঞের পক্ষে সাফাই গাইছে

ছবি : রয়টার্স

পাকিস্তান প্রতিবছর ৫ আগস্ট ‘ইউম-ই-ইস্তাহসাল’ বা ‘শোষণ দিবস’ পালন করে। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের প্রতিবাদে এবং কাশ্মীরের জনগণের প্রতি সংহতি জানাতেই পাকিস্তান দিনটি পালন করে।ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরের জনগণের দুর্দশার দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং মানবাধিকার রক্ষায় তাদের প্রতি আবেগঘন আবেদন জানাতেই ‘শোষণ দিবস’ পালন করা হয়। 

তবে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের সাম্প্রতিক সহিংসতা কেবল আরেকটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উপাখ্যান নয়, এটি আসলে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইসলামাবাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আইনসভার সংরক্ষিত আসন বরাদ্দের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভকে নিষ্ঠুর কায়দায় দমন করা হচ্ছে। গত ২৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নির্বাচন সামনে রেখে গত ৫ জুন থেকে বিক্ষোভ করছে কাশ্মীরের সর্বস্তরের জনগণ।তাদের দাবি ৩৮ দফা হলেও মূল দাবি হলো—বিধানসভায় কাশ্মীরের বাইরের কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। এ সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে আসলে ইসলামাবাদ কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণ করে।

বিক্ষোভে নেতারা অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে এবং বিক্ষোভে শত্রুভাবাপন্ন উপাদান অনুপ্রবেশ করেছে দাবি করে এই হত্যাযজ্ঞের পক্ষে সাফাই গাইছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের এই প্রতিবেদনগুলোকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে এবং একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটিকে নিষিদ্ধ করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অ্যামনেস্টি কাশ্মীরে যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।

সহিংসতার চেয়েও বেশি বেদনা ও উদ্বেগের বিষয় হলো—কাশ্মীরকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাগাড়ম্বর। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের বিক্ষোভকারীদের ‘ভারতের মতো শত্রু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।এই ধরনের ভাষা শুধু উত্তেজনাকেই উসকে দেয় না; এটি নাগরিকদের গণতান্ত্রিক বৈধতা কেড়ে নেয় এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে উপস্থাপন করে। একটি সরকার যখন নিজের বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী নাগরিকদের শত্রু ভাবা শুরু করে; তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা আর প্রাণঘাতী দমনের মধ্যে ফারাক দ্রুতই ফুরিয়ে আসে।

ইসলামাবাদ যখন অন্য জায়গায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিন্দা জানাতে বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানায়, ঠিক তখনই নিজের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের পক্ষে সাফাই গায়। এই বৈপরীত্যকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। আসলে মানবাধিকারকে কখনো আলাদা আলাদাভাবে বিচার করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। কূটনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য একদিকে বেছে বেছে ব্যবহার করা এবং অন্যদিকে নিজ দেশে অস্বীকার করা; একসঙ্গে চলতে পারে না।

স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তানে মানবাধিকারের চিত্র গুম, নির্বিচার আটক, বাকস্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মতো অভিযোগে কলঙ্কিত হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রদেশে বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। জাতিগত সংখ্যালঘু এবং রাজনৈতিক কর্মীরা বারবার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ তুলেছেন।

এই প্যাটার্নটি অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেলুচিস্তানে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বছরের পর বছর ধরে, বেলুচ পরিবারগুলো তাদের নিখোঁজ আত্মীয়দের ছবি নিয়ে দেশজুড়ে পদযাত্রা করছে, রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইছে। কিন্তু রাষ্ট্র জবাব দেয় না; হয় নীরব থাকে, নয় গুলি চালায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে। তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বারবার এই মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনার পক্ষে সাফাই গাইছে। তারা বলছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য সামরিক অভিযানগুলো দরকারি। তবে বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

বৈধ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে সংলাপের পরিবর্তে সামরিক শক্তি দিয়ে দমন করতে গেলে কী ঘটে, তা জানার জন্য অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল পাকিস্তানের একই ধরনের দমন-পীড়নের প্রতিবাদ জানাতে গিয়েই। পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রত্যাখ্যান, নির্বাচনের ফলাফল উপেক্ষা, রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প হিসেবে বলপ্রয়োগের ওপর বিশ্বাস রাখার কারণেই রাজনৈতিক আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বদলে গিয়েছিল।

ইতিহাস হয়তো কখনো হুবহু একইভাবে ফিরে আসে না। তবুও ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা রেখে যায়। যার প্রধান শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রগুলো নিপীড়নের মাধ্যমে খুব কমই স্থায়ী একতা অর্জন করতে পারে। গায়ের জোরে হয়তো সাময়িকভাবে কণ্ঠরোধ করা যায়; কিন্তু মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব এবং ন্যায়ের দাবিকে কখনোই নিভিয়ে দেওয়া যায় না। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানবাধিকার প্রশ্নে পাকিস্তানের দ্বিচারিতা আর বৈপরীত্য নিয়ে সবচেয়ে কঠোর কিছু সমালোচনা পাকিস্তানের ভেতর থেকেই আসছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি ইউরোপের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করার পাশাপাশি, কাশ্মীরের ক্র্যাকডাউনের সময় নিহতদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নীরবতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।

একইভাবে, পাকিস্তানি ভাষ্যকার এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও প্রশ্ন তুলেছেন যে সরকারের অগ্রাধিকারগুলো নিজ দেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কি না। এই ধরনের সমালোচনাকে কোনোভাবেই বিদেশি প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি সাংবিধানিক আদর্শ এবং রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্যে বাড়তে থাকা ফারাক নিয়ে দেশের ভেতরে সৃষ্ট অস্বস্তিকেই সামনে আনে।

পাকিস্তান নিঃসন্দেহে জঙ্গিবাদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা রকম প্রকৃত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে কি না তা দিয়ে বিচার্য হয় না, বরং তারা কিভাবে সেগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে তা দিয়েই বিচার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দাবি করে যে, বলপ্রয়োগ যেন প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক এবং জবাবদিহিমূলক হয়।

পাকিস্তান যত দিন না পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর, বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি সেই একই প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করছে, যা তারা অন্য কোথাও দাবি করে; তত দিন তাদের মানবাধিকারের পক্ষে ওকালতি দেশের ভেতরের অস্বস্তিকর বাস্তবতার কারণে ম্লান হতে থাকবে। মানবাধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা আন্তর্জাতিক ফোরামে শুরু হয় না, বরং শুরু হয় একটি দেশের নিজস্ব সীমানার ভেতর থেকে।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

LEAVE A REPLY