বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। ছবি : এএফপি
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাওয়া বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে তিন দিনে ডারউইন টেস্ট জিতে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। বাংলাদেশের এই জয়কে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া মূলত ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে ডারউইনে হেরে বসেছে। বিশেষ করে স্বাগতিক টপ অর্ডার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। উসমান খাজার অবসরের পর দলটির ব্যাটিং লাইনআপে দুর্বলতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে কি বদল আনার সময় এসে গেছে?
ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো মনে করছে, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে অস্ট্রেলিয়াকে সামনে এগোতে হলে অভিজ্ঞদের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি নতুনদেরও সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ম্যাকাইয়ে আগামী ২২ আগস্ট শুরু হবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার শেষ টেস্ট। সিরিজ হার এড়াতে এই ম্যাচে জয়ের বিকল্প নেই স্বাগতিকদের। ম্যাকাই টেস্ট সামনে রেখে অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য ব্যাটিং বিকল্প নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছে ক্রিকইনফো। সেখানে ম্যাট রেনশ, অলিভার পিক, জশ ইংলিস, কুপার কনোলিসহ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের নাম উঠে এসেছে।
খাজার জায়গা পূরণই বড় চ্যালেঞ্জ
উসমান খাজা অবসরে যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলের ওপেনিংয়ে নির্ভরতার প্রতীক ছিলেন খাজা। তার জায়গায় কে থিতু হবে, সেটিই এখন নির্বাচকদের সামনে বড় প্রশ্ন।
এই জায়গায় ম্যাট রেনশর নাম নতুন নয়। বাঁহাতি এই ব্যাটার আগেও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলেছেন।২০১৬-১৭ মৌসুমে টেস্ট অভিষেকের পর ১১টি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার।
ঘরোয়া ক্রিকেটে রেনশর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সও তাকে আলোচনায় রেখেছে। বিশেষ করে শেফিল্ড শিল্ডে ওপেনার হিসেবে তার অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রেনশর কি আবার ওপেনার হিসেবে ফিরবেন?
রেনশ ক্যারিয়ারের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওপেন করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলে তার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কখনো ওপেনিং, কখনো মিডল অর্ডার—বিভিন্ন ভূমিকায় খেলতে হয়েছে তাকে। গত জুনে বাংলাদেশ সফরে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে তিনি মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে রেনশ জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হতে পারে অভিজ্ঞতা। ৩০ বছর বয়সী এই ব্যাটারের আরো কয়েক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সামর্থ্য আছে।
আলোচনায় ১৯ বছরের অলিভার পিক
রেনশর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ ব্যাটিংয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি অলিভার পিক। ১৯ বছর বয়সেই অস্ট্রেলিয়ার সাদা বলের দলে জায়গা করে নিয়েছেন ভিক্টোরিয়ার এই তরুণ। ২০২৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপাজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।

এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দ্রুতই জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে যান পিক। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তার আন্তর্জাতিক অভিষেকও হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সাধারণত তরুণদের টেস্ট দলে ঢোকার আগে দীর্ঘ সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে পরখ করা হয়। কিন্তু পিকের ক্ষেত্রে তার বয়সের তুলনায় দ্রুত উত্থান নির্বাচকদের নজর কেড়েছে।
জশ ইংলিসও বিকল্প হতে পারেন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম জশ ইংলিস। উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সীমিত ওভারের দলে নিজের জায়গা পাকা করেছেন তিনি। ৫টি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার।
ইংলিসকে খেলানো হলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং গভীরতা যেমন বাড়বে, তেমনি বিকল্প উইকেটকিপারও পাওয়া যাবে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া তাকে সাত নম্বরে বিশেষজ্ঞ ব্যাটার হিসেবে খেলিয়েছে। ফলে ব্যাটিং লাইনআপে অতিরিক্ত একজন দক্ষ ব্যাটার রাখার চিন্তায় তার নাম স্বাভাবিকভাবেই আসে।
তবে ইংলিসকে টপ অর্ডারে খেলানোর প্রশ্নটি আলাদা। অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকদের ঠিক করতে হবে, তাকে কি কিপার-ব্যাটার হিসেবেই রাখা হবে, নাকি প্রয়োজনে ব্যাটিং অর্ডারের ওপরে তোলা হবে?
শুধু নতুন মুখ নয়, অভিজ্ঞদের নিয়েও প্রশ্ন
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নিয়ে আলোচনা শুধু নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মারনাস লাবুশেন, ক্যামেরন গ্রিন ও বিউ ওয়েবস্টারদের ব্যাটিং পজিশন নিয়েও নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
অলরাউন্ডার বিউ ওয়েবস্টার জানিয়েছেন, ব্যাটিংয়ে ভালো করে তিনি দলে জায়গা ধরে রাখতে চান, ‘আমার প্রথম ৮ টেস্টে ব্যাট হাতে পারফরম্যান্স দেখে মনে হয়, আমাকে সত্যিকারের টপ-সিক্স ব্যাটার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’
অভিষেক টেস্টেই যশপ্রীত বুমরাকে ভড়কে দেওয়ার পর থেকে ফর্ম হারাতে থাকেন স্যাম কনস্টাস। এক সময় দল থেকেই বাদ পড়েন। কনস্টাসকেও ফেরানো হতে পারে। এক টেস্ট খেলা কুপার কনোলিও সুযোগ পেতে পারেন।
সামনে কী হতে পারে?
উসমান খাজার উত্তরসূরি কে হবেন, শুধু এই প্রশ্নেই আটকে থাকলে চলবে না। বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য অস্ট্রেলিয়া কেমন ব্যাটিং লাইনআপ তৈরি করতে চায়, সেটিই মূল বিষয়।
ম্যাট রেনশর মতো অভিজ্ঞ ঘরোয়া পারফর্মার, জশ ইংলিসের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত ব্যাটার এবং অলিভার পিক, কুপার কনোলি, স্যাম কনস্টাসের মতো উদীয়মান প্রতিভা—তিন ধরনের বিকল্পই অস্ট্রেলিয়ার হাতে আছে।
একটি বিষয় পরিষ্কার—অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে প্রজন্ম বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইন টেস্ট হার এক ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে সেই পরিবর্তনকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এখন নির্বাচকদের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, অভিজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা বজায় থাকবে নাকি রেনশ-ইংলিস-পিকদের সামনে রেখে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দল নতুন যুগের সূচনা করবে।









































