সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের স্টাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদালয়ের একটি নতুন গবেষণায় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটে মানুষ ও প্রাণীর মমি করা দেহাংশ বিক্রির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।গবেষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন দোকান, ই-কমার্স সাইট এবং নিলাম প্রতিষ্ঠানের ১২৮টি পোস্ট পর্যালোচনা করেছেন।
গবেষক দলটি কয়েকটি দেহাংশে জীবাণু বা অণুজীবের কারণে পচনের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছে। অথচ বিক্রেতারা প্রায়ই ক্রেতাদের এগুলো নিরাপদে রাখা বা ব্যবহার করার কোনো পরামর্শ দেননি। কিছু ছবিতে দেখা গেছে, মানুষ খালি হাতে মমি করা মানবদেহাংশ স্পর্শ করছে।এ ধরনের কাজ ক্রেতা, বিক্রেতা, ডাককর্মী ও কাস্টমস কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পর্যালোচনা করা সামগ্রীর অধিকাংশই ছিল মানুষের দেহাংশ। এর মধ্যে হাত ও পায়ের মতো আলাদা হয়ে যাওয়া অংশ বেশি দেখা গেছে। নমুনাগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ছিল মানুষের মাথার অংশ, যেগুলো বিভিন্ন অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।তবে বিক্রির তালিকায় মমি করা প্রাণীও ছিল।
সব ক্ষেত্রে যে খালি চোখে ক্ষতি বোঝা গেছে, তা নয়। ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সব সময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বা ভুল উপায়ে রাখার কারণে মমি করা টিস্যুর ভেতর বা বাইরে অণুজীব তৈরি হয়। এসব দেহাংশ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া, খোলা বা প্যাকেট করার সময় ছত্রাকের রেনু বা স্পোর বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।ঝুঁকি কেবল অণুজীব বা জীবাণুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতীতে মমি সংরক্ষণে আর্সেনিক, পারদ ও সিসার মতো মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হতো। তা ছাড়া মমি করা টিস্যুতে জৈবিক উপাদান থাকে। তাই কোনো নমুনা বাইরে থেকে শুকনো বা ভালো দেখালেও তা সাবধানে নাড়াচাড়া করা জরুরি।
অতীতের কিছু ঘটনা দেখায় যে, কেন ছত্রাকের সংস্পর্শে আসা বিপজ্জনক হতে পারে। ১৯৭০-এর দশকে ক্রাকোভে রাজা চতুর্থ কাসিমির জাগিয়েলনের সমাধি কক্ষে ১২ জন কর্মী ঢুকেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ১০ জনই মারা যান। সেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে অ্যাসপারজিলাস নামক ছত্রাকের রেনুকে দায়ী করা হয়। এ ছাড়া তুতেনখামেনের সমাধি খোলার পর লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর পেছনেও ছত্রাকের সংক্রমণকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। অনলাইনে কেনাবেচা ও পরিবহনসংক্রান্ত নিয়মেও নানা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। মানবদেহাংশ পাঠানো বা পার্সেল করার নিয়ম যে বিক্রেতারা বোঝেন, পোস্টে তার খুব একটা প্রমাণ মেলেনি। স্বাস্থ্যঝুঁকি বা আমদানি নিয়মের তোয়াক্কা না করেই পার্সেলগুলো এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডাক বিভাগ, কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। গবেষণা বা দাফনের কাজের বাইরে মানবদেহাংশের ব্যক্তিগত ব্যবসা কোথায় নিষিদ্ধ, পার্সেল সংক্রান্ত নিয়মে তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকা উচিত। সন্দেহজনক পার্সেল পরীক্ষা করার সময় কর্মীদের যথাযথ স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলা প্রয়োজন। এই গবেষণা মানবদেহাংশ সংগ্রহ বা বিক্রির পেছনে থাকা বড় একটি সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। বিরল মমি করা দেহাংশের অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক মূল্য রয়েছে। কিন্তু অনলাইন বাজারের কারণে তদারকি ছাড়াই এগুলো ব্যক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। গবেষকরা পরীক্ষা করার আগেই এ ধরনের ব্যবসায় মমি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গবেষকরা সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেছেন, ইন্টারনেটে মমি করা মানবদেহাংশের পোস্ট দেখলে তা যেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। সন্দেহজনক কোনো কেনাবেচা নজরে এলে স্ক্রিনশট, প্রোফাইল লিঙ্ক ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। যুক্তরাজ্যে বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেন এ ধরনের বিক্রির খবর ‘বাবাও’ -এর মানবদেহাংশ কেনাবেচাসংক্রান্ত টাস্কফোর্সকে জানানো হয়।
বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের ভেতরের আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োজন। গবেষক, ডাক বিভাগ, সীমান্ত রক্ষাকারী সংস্থা, পুলিশ ও আইনপ্রণেতাদের একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে এই গবেষণা। স্পষ্ট নিয়ম, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং শিপিং পয়েন্টে কড়া নজরদারি থাকলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে। একই সাথে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য থেকে মানবদেহাংশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।









































