‘দ্য অডিসি’র নারী চরিত্রগুলো কি হারিয়েছে নিজেদের গভীরতা?

গ্রিক পুরাণের অন্যতম বিখ্যাত কাহিনি ‘দ্য অডিসি’। সেই মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে।তবে সিনেমাটির চরিত্রায়ণ নিয়ে উঠেছে ভিন্ন প্রশ্ন। বিশেষ করে পেনেলোপি, অ্যাথেনা ও সার্সির মতো গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রগুলো কি তাদের প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা হারিয়েছে?

‘দ্য অডিসি’র নারী চরিত্র নিয়ে এমনই প্রশ্ন তুলেছেন মনোবিজ্ঞানী ও লেখক জিলিয়ান ও’শিয়া ব্রাউন। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সাইকোলজি টুডে’র এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, সিনেমাটি গ্রিক পুরাণের বিশাল পরিসর তুলে ধরতে পারলেও নারী চরিত্রগুলোর জটিল মনস্তত্ত্বকে অনেকটাই সরল করে ফেলেছে।

তিনি বলেন, বাস্তব জীবনে কোনো মানুষই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়।মানুষের মধ্যে যেমন গুণ থাকে, তেমনি থাকে দুর্বলতা, দ্বন্দ্ব ও অন্ধকার দিক। আর এই বৈপরীত্যই একটি চরিত্রকে বাস্তব ও আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু ‘দ্য অডিসি’তে পুরুষ চরিত্র ওডিসিউসের ক্ষেত্রে এই জটিলতা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হলেও নারী চরিত্রগুলোকে অনেক বেশি একমাত্রিক মনে হয়েছে।

পেনেলোপি শুধু অপেক্ষায় থাকা স্ত্রী নন

‘দ্য অডিসি’র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পেনেলোপি।প্রচলিতভাবে তাকে দীর্ঘ ২০ বছর স্বামী ওডিসিউসের অপেক্ষায় থাকা ধৈর্যশীল স্ত্রী হিসেবে দেখা হয়। সিনেমাতেও তার এই দিকটিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন ব্রাউন।

বাস্তব থেকে ভার্চুয়ালে, সোশ্যাল মিডিয়ার আগে ও পরে নারী জীবন

কিন্তু গ্রিক পুরাণের পেনেলোপি ছিলেন যথেষ্ট কৌশলী ও বুদ্ধিমান। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ইথাকার সংকট সামলানোর পাশাপাশি তিনি ক্ষমতালোভী পাত্রদের মোকাবিলা করেন বুদ্ধি ও কৌশলে।

পাত্রদের এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দিনের বেলা কাপড় বোনা এবং রাতে তা খুলে ফেলার কৌশল তার বুদ্ধিমত্তারই পরিচয় দেয়।আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওডিসিউস ফিরে আসার পরও পেনেলোপি সরাসরি তার পরিচয় মেনে নেননি।

তিনি স্বামীর পরিচয় যাচাই করতে তাদের বৈবাহিক শয্যা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই শয্যা ছিল একটি জীবন্ত জলপাইগাছকে কেন্দ্র করে তৈরি। বিষয়টি জানতেন শুধু প্রকৃত ওডিসিউস। তার প্রতিক্রিয়া দেখে পেনেলোপি নিশ্চিত হন, ফিরে আসা মানুষটিই তার স্বামী।

অর্থাৎ পেনেলোপি শুধু অপেক্ষমাণ স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির একজন কৌশলী নারী। ব্রাউনের মতে, সিনেমায় তার এই জটিল চরিত্রের অনেকটাই অনুপস্থিত।

সন্তান নিতে ইউরোপে ছুটছেন মার্কিন দম্পতিরা, চিকিৎসার সঙ্গে চলছে ভ্রমণও

অ্যাথেনার অন্য রূপ কোথায়?

গ্রিক পুরাণে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী অ্যাথেনা ওডিসিউসের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। সিনেমায় তাকে মূলত ওডিসিউসের পথপ্রদর্শক বা বিবেকের মতো করে দেখা হয়েছে।

কিন্তু পুরাণের অ্যাথেনা ছিলেন আরও জটিল চরিত্র। তার মধ্যে যেমন ছিল বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল, তেমনি ছিল কঠোরতা ও নির্মমতার দিকও।

মনোবিজ্ঞানীর বিশ্লেষণে মেডুসার কাহিনিটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত পুরাণে, অ্যাথেনার মন্দিরে পোসেইডনের সঙ্গে মেডুসার ঘটনার পর অ্যাথেনা মেডুসাকেই অভিশাপ দেন। তার চুল সাপে পরিণত হয় এবং তার দৃষ্টিতে মানুষ পাথরে পরিণত হতে থাকে।

এই কাহিনি অ্যাথেনার চরিত্রের একটি দ্বৈত দিক সামনে আনে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক হয়েও তিনি সবসময় সহানুভূতিশীল নন। বরং নিজের মর্যাদা, নিয়ম ও কর্তৃত্ব রক্ষায় তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই বৈপরীত্যই অ্যাথেনাকে আরও জটিল চরিত্রে পরিণত করে। কিন্তু সিনেমায় তার সেই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব কতটা জায়গা পেয়েছে, সেটিই প্রশ্ন।

সার্সি কি শুধু খলনায়িকা?

সার্সিকে সাধারণত শক্তিশালী জাদুকরী হিসেবে দেখা হয়। ওডিসিউস ও তার সঙ্গীদের বিপথে নেওয়া এবং পুরুষদের পশুতে রূপান্তর করার কারণে তাকে অনেক সময় গল্পের খলচরিত্র হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু গ্রিক পুরাণে সার্সির ভূমিকা এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও ক্ষমতাবান এক নারী চরিত্র। তার জাদুর মাধ্যমে পুরুষদের পশুতে রূপান্তরকে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও দুর্বলতার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওডিসিউসের সঙ্গে সংঘাতের পর সার্সিই একসময় তার সহযোগী হয়ে ওঠেন। ভবিষ্যৎ বিপদ মোকাবিলা এবং পাতালপুরীতে যাওয়ার পথ সম্পর্কে তিনি ওডিসিউসকে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান দেন।

ফলে সার্সিকে কেবল এমন এক ‘ডাইনি’ হিসেবে দেখলে তার চরিত্রের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। ব্রাউনের মতে, সিনেমায় তাকে মূলত এড়িয়ে যাওয়ার মতো আরেকটি বিপজ্জনক চরিত্র হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

চরিত্রের অসম্পূর্ণতাই কি তাকে আকর্ষণীয় করে?

মনোবিজ্ঞানী হেইঞ্জ কোহুটের ধারণা তুলে ধরে ব্রাউন বলেন, মানুষের আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে অন্যের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক ও মানসিক সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমার চরিত্রের ক্ষেত্রেও দর্শকের সঙ্গে এই ধরনের সংযোগ তৈরি হওয়া জরুরি।

এ কারণেই ‘জোকার’ ছবির মতো চরিত্র দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। চরিত্রটি একই সঙ্গে দুর্বল, মানবিক এবং ভয়ংকর—এই বৈপরীত্যই তাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

অন্যদিকে, কোনো চরিত্র যদি কেবল ভালো বা কেবল খারাপ হয়, তাহলে তার সঙ্গে দর্শকের গভীর মানসিক সংযোগ তৈরি হওয়া কঠিন। ব্রাউনের মতে, ‘দ্য অডিসি’র নারী চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

তাই প্রশ্নটা শুধু সিনেমায় পেনেলোপি, অ্যাথেনা কিংবা সার্সিকে কতটা সময় দেওয়া হয়েছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো : তাদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা, বুদ্ধি, ক্ষমতা ও অন্ধকার দিকগুলো কতটা তুলে ধরা হয়েছে।

কারণ গ্রিক পুরাণের এই নারী চরিত্রগুলো শুধু কোনো পুরুষ নায়কের গল্পের পার্শ্বচরিত্র নন। তাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে ক্ষমতা, কৌশল, দ্বন্দ্ব ও স্বতন্ত্র গল্প। আর সেই গভীরতাই হয়তো পর্দায় আরও বেশি করে তুলে ধরার দাবি রাখে।

LEAVE A REPLY