অমিতাভ বচ্চন
অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল না মসৃণ। একের পর এক সিনেমা ব্যর্থ হয়েছে, শুনতে হয়েছে নানা সমালোচনা।তবু দমে যাননি অমিতাভ বচ্চন। সময়ের সঙ্গে নিজের অভিনয়, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়। হয়ে উঠেছেন বলিউডের শাহেনশাহ। আজও সমান ব্যস্ততায় কাজ করে চলেছেন তিনি।বর্তমানে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র শুটিং নিয়ে ব্যস্ত এই অভিনেতা। কাগজে কলমে আজ তার ৮৫তম জন্মদিন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বাঁকে বাঁকে রয়েছে এমন অনেক ঘটনা, যা ভক্তদের কাছে আজও আগ্রহের বিষয়।
রেডিওতে প্রত্যাখ্যান, কণ্ঠ দিয়েই সিনেমায় অভিষেক
সিনেমায় আসার আগে রেডিওতে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন অমিতাভ।কিন্তু দিল্লির ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ তাকে ফিরিয়ে দেয়। সেই প্রত্যাখ্যান অবশ্য তার ভবিষ্যৎ আটকে রাখতে পারেনি। অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সিনেমার জগতে পা রেখেছিলেন অমিতাভ। ১৯৬৯ সালে মৃণাল সেন পরিচালিত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘ভুবন সোম’-এ ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে অসংখ্য সিনেমায় তার গভীর কণ্ঠস্বর গল্পের আবহ তৈরি করেছে।অভিনয়ের পাশাপাশি ভাষ্যকার হিসেবেও তৈরি করেছেন আলাদা পরিচিতি। পরবর্তী সময়ে তার কণ্ঠস্বরই হয়ে ওঠে ভারতীয় বিনোদনজগতের অন্যতম পরিচিত সম্পদ।

টানা ১২ সিনেমার ব্যর্থতা, তারপর ‘জঞ্জির’
আজকের অমিতাভ বচ্চনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে তার অভিনীত একাধিক সিনেমা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে টানা ১২টি সিনেমা ব্যর্থ হওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এরপর মুক্তি পায় ‘জঞ্জির’। সিনেমাটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং বলিউডে তার অবস্থান দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন মেহমুদ
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল অমিতাভকে। প্রচলিত কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সময়ে অভিনেতা মেহমুদ তাকে নিজের বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সুনীল দত্ত পরিচালিত ‘রেশমা অউর শেরা’ সিনেমায় মূক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান অমিতাভ। শোনা যায়, তার ভারী কণ্ঠস্বর চরিত্রটির সঙ্গে মানানসই হবে না—এমন ধারণা থেকেই তাকে সংলাপহীন চরিত্রে নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রচলিত একটি বর্ণনায় বলা হয়, অমিতাভের অভিনয়জীবনের শুরুতে সহযোগিতা করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভিনেত্রী নার্গিসের কাছে সুপারিশপত্র পাঠিয়েছিলেন। তবে এসব ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা থাকায় সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের বদলে প্রচলিত দাবি হিসেবেই দেখা হয়।

বিরতি নিয়েছিলেন অভিনয় থেকে
১৯৯১ সালে মুক্তির কথা থাকলেও নানা কারণে পিছিয়ে যায় ‘ইনসানিয়ত’ সিনেমার মুক্তি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে এটি প্রেক্ষাগৃহে আসে। এরপর অভিনয় থেকে কিছুদিনের বিরতি নেন অমিতাভ। সহশিল্পী নূতন ও বিনোদ মেহরার মৃত্যুসহ নানা বিষয় সিনেমাটির মুক্তি বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
গানেও মুগ্ধ করেছেন
অভিনয়ের পাশাপাশি গানেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন অমিতাভ। তার ভারী কণ্ঠে গাওয়া বেশ কিছু গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ‘লাওয়ারিস’ সিনেমার ‘মেরে অঙ্গনে মে’ এবং ‘সিলসিলা’র ‘নীলা আসমান সো গয়া’ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ‘বাগবান’ সিনেমার ‘ম্যায় ইয়াহাঁ তু ওয়াহাঁ’, ‘কহানি’র ‘একলা চলো রে’ এবং ‘বোল বচ্চন’ সিনেমার শিরোনামসংগীতেও শোনা গেছে তার কণ্ঠ।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে
অমিতাভ বচ্চনের অভিনীত বেশ কিছু জনপ্রিয় সিনেমায় তার চরিত্রের মৃত্যু হয়েছে। ‘দীওয়ার’ ও ‘শোলে’ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে ‘কুলি’ সিনেমায় বাস্তবের এক দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল গল্পের পরিণতি। শুটিংয়ের সময় গুরুতর আহত হয়েছিলেন অমিতাভ। তার জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছিল গভীর উদ্বেগ। এরপর পরিচালক মনমোহন দেসাই সিনেমাটির চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আনেন। শেষ পর্যন্ত পর্দায় তার চরিত্র ইকবালকে বাঁচিয়ে রাখা হয়।
পর্দায় কখনো নিজের নামেই
অমিতাভকে বিভিন্ন সিনেমায় বিশেষ চরিত্রে কিংবা অতিথি উপস্থিতিতে দেখা গেছে। কিছু সিনেমায় নিজের নামেই হাজির হয়েছেন তিনি। ‘গুড্ডি’, ‘গোলমাল’ ও ‘হিরো হিরালাল’ তেমনই কয়েকটি উদাহরণ।
অমিতাভের অভিনয়জীবনের আরও একটি মজার তথ্য হলো, প্রায় ২০টিরও বেশি সিনেমায় তার চরিত্রের নাম ছিল ‘বিজয়’। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৪টি সিনেমায় দ্বৈত চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি।

ছোট পর্দায়ও সফল শাহেনশাহ
একসময় বড় পর্দার অনেক তারকাই টেলিভিশনে কাজ করতে দ্বিধা করতেন। সেই সময়ে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন অমিতাভ। তার উপস্থাপনা, প্রতিযোগীদের সঙ্গে আন্তরিক কথোপকথন এবং ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। বর্তমানে অনুষ্ঠানটির ১৮তম মৌসুম নিয়ে ব্যস্ত তিনি।
জয়া বচ্চনের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্য
১৯৭৩ সালে অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে বিয়ে করেন অমিতাভ। তাদের অভিনীত ‘অভিমান’ সিনেমাটি মুক্তি পায় বিয়ের প্রায় এক মাস পর। পর্দার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও তাদের জুটি দীর্ঘদিন ধরে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের পথচলায় একাধিক প্রজন্মের দর্শককে মুগ্ধ করেছেন অমিতাভ বচ্চন। বয়স ও শারীরিক চ্যালেঞ্জ পেরিয়েও কাজের প্রতি তার আগ্রহ অটুট। এখন দর্শকের অপেক্ষা তার নতুন কাজের জন্য। বিশেষ করে ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’র দ্বিতীয় পর্বে তাকে আবারও পর্দায় দেখার প্রত্যাশায় রয়েছেন ভক্তরা।










































