নির্যাতনের শিকার হয়েও নীরব, সব সহ্য করলেই কি সংসার টেকে?

সংগৃহীত ছবি

বিয়ে মানেই কি যেকোনো মূল্যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা? সংসার বাঁচাতে গিয়ে যদি নির্যাতন সহ্য করতে হয়, তাহলে কী করবেন? আবার দাম্পত্য বিরোধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেই কি কাউকে দোষী ধরে নেওয়া উচিত?

বিয়ে, বিচ্ছেদ ও পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই উঠে এসেছে ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ ২০২৬-এর এক আলোচনায়।

‘দ্য ফেটাল ভাও: হোয়েন ‘আই ডু’ টার্নস ডেডলি’ শীর্ষক অধিবেশনে অংশ নেন আইনজীবী ও অধিকারকর্মী ফ্লাভিয়া অ্যাগনেস, পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজ করা তথ্যচিত্র নির্মাতা দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও দম্পতি-থেরাপিস্ট চিকিৎসক পবন সোনার।

আলোচনায় নারীদের ওপর পারিবারিক নির্যাতন, পুরুষদের অভিযোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সামাজিক চাপ নিয়ে ভিন্নমত উঠে আসে। তবে আলোচকদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—নির্যাতনের শিকার মানুষের কথা শোনা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সংসার বাঁচাতে নীরব থাকেন অনেক নারী

ফ্লাভিয়া অ্যাগনেসের মতে, নারীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি আলোচনায় আনতে হলে এর প্রকৃত কারণের দিকে নজর দিতে হবে। যৌতুকের কারণে নারীর মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।তার বক্তব্য, নারীরা শুধু যৌতুকের কারণে মারা যান না; তাদের মৃত্যুর পেছনে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নারীরা সুরক্ষার জন্য তৈরি আইন অপব্যবহার করেন—এমন ধারণা অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আড়াল করে দেয়। অনেক নারী দাম্পত্য জীবনে নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক চাপ, লোকলজ্জা কিংবা সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না। কখনো তাঁদের মৃত্যুর পর, আবার কখনো বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলে নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আসে।

অ্যাগনেসের মতে, বিয়ে টিকিয়ে রাখার সামাজিক প্রত্যাশা নারীদের অনেক সময় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে বাধা দেয়। বিচ্ছেদ আগের তুলনায় সামাজিকভাবে কিছুটা গ্রহণযোগ্য হলেও সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে এখনো নানা বাধার মুখে পড়তে হয় অনেক নারীকে।

পুরুষের অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে

অন্যদিকে দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজের বক্তব্য, দাম্পত্য সম্পর্কে নির্যাতন বা অন্যায়ের শিকার পুরুষদের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, কেউ অন্যায়ের শিকার হলে শুধু নারী বা পুরুষ পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর অভিযোগ বিচার করা উচিত নয়। দাম্পত্য বিরোধে পুরুষদের অভিজ্ঞতা ও তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।

ভরদ্বাজ পুরুষদের ওপর পারিবারিক নির্যাতনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের অভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র না থাকলে সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে অ্যাগনেসের বক্তব্য, পুরুষেরা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন—এ বাস্তবতা স্বীকার করলেও দাম্পত্য জীবনে নারীরা যে কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি হন, তা উপেক্ষা করা যাবে না।

সম্পর্কের শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত আগে থেকেই

দম্পতি-থেরাপিস্ট পবন সোনারের মতে, অনেক দম্পতি সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে আসেন তখন, যখন পরিস্থিতি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অথচ সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমারেখা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা আগে থেকেই প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মানুষকে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও সম্পর্ক কীভাবে সামলাতে হয়, সে বিষয়ে যথেষ্ট শিক্ষা দেওয়া হয় না। শিশু-কিশোরদের বয়স উপযোগীভাবে সম্মতি, শ্রদ্ধা এবং সম্পর্কের দায়িত্ব সম্পর্কে শেখানো জরুরি।

একই সঙ্গে সংসার টিকিয়ে রাখার সব দায়িত্ব নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামো ও সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝে নারী-পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিয়ে টিকিয়ে রাখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা

আলোচনায় মিথ্যা অভিযোগ, নারী-পুরুষের প্রতি অসম আচরণ কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের প্রকৃত ব্যাপ্তি নিয়ে সব প্রশ্নের সমাধান আসেনি। তবে আলোচকেরা এমন একটি বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে এক পক্ষের কষ্ট স্বীকার করতে গিয়ে অন্য পক্ষের অভিজ্ঞতা অস্বীকার করার প্রবণতা তৈরি হয়।

কোনো বিয়ে ভেঙে যাওয়া নিজে থেকেই নির্যাতনের প্রমাণ নয়। আবার কিছু অভিযোগ মিথ্যা হতে পারে বলে প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির বক্তব্য সন্দেহের চোখে দেখাও ঠিক নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া—দুটিই জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন শুধু একটি সংসার টিকবে কি না, তা নয়। বরং সম্পর্কের মধ্যে নির্যাতনের শিকার কেউ যেন সামাজিক অপমানের ভয় ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারেন এবং নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রত্যেকের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

LEAVE A REPLY