শীতের হালকা বাতাস, কমে আসা আর্দ্রতা কিংবা দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকা—এসবের প্রভাব পড়ে ত্বকের পাশাপাশি ঠোঁটেও। অনেকের ক্ষেত্রে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যায়, খোসা উঠতে থাকে, কখনো দেখা দেয় ফাটার সমস্যাও।তখন স্বাভাবিকভাবেই বারবার ঠোঁটে জিহ্বা বুলিয়ে আর্দ্র রাখার চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও পরে শুষ্কতা আরও বেড়ে যেতে পারে। শুধু আবহাওয়াই নয়, দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস, প্রসাধনীর উপাদান কিংবা শরীরে পানির ঘাটতিও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
ঠোঁট কেন সহজে শুকিয়ে যায়?
মুখের অন্যান্য অংশের ত্বকের তুলনায় ঠোঁটের ত্বক বেশ পাতলা ও সংবেদনশীল।এ ছাড়া ঠোঁটে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি নেই। ফলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাও তুলনামূলক কম। এ কারণে ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস কিংবা রোদের সংস্পর্শে এলে ঠোঁট দ্রুত আর্দ্রতা হারাতে পারে।
ঠোঁট বারবার শুকিয়ে যাওয়ার ৬ কারণ
১. শীতের শুষ্ক বাতাস
ঠান্ডা আবহাওয়া ও বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যায়।শীতকালে ঘরের ভেতরেও বাতাস শুষ্ক থাকতে পারে। ফলে বাইরে কিংবা ঘরে—দুই জায়গাতেই ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
২. বারবার ঠোঁটে জিহ্বা বুলানো
ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই স্বস্তি পেতে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেন। কিন্তু লালার পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর ঠোঁট আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে। লালায় থাকা কিছু উপাদানও সংবেদনশীল ঠোঁটে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।ফলে বারবার ঠোঁট ভেজানোর অভ্যাসে শুষ্কতার সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান না করা
শরীরে পানির ঘাটতি হলে তার প্রভাব ঠোঁটেও পড়তে পারে। বিশেষ করে শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হওয়ায় অনেকে পানি পান কমিয়ে দেন। এতে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হলে ঠোঁট শুষ্ক হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
৪. রোদ ও বাতাসের সংস্পর্শ
শুধু শীত নয়, অতিরিক্ত রোদেও ঠোঁটের ক্ষতি হতে পারে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে শুষ্কতা ও প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আবার দীর্ঘক্ষণ বাতাসের সংস্পর্শে থাকলেও ঠোঁটের আর্দ্রতা কমে যায়।
৫. লিপবাম ও প্রসাধনীর উপাদান
সব লিপবাম বা লিপস্টিক সবার ত্বকে মানানসই হয় না। কিছু পণ্যে থাকা সুগন্ধি, ফ্লেভার, মেনথল, কর্পূর কিংবা অন্যান্য উপাদান ঠোঁটে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ঠোঁট আগে থেকেই শুষ্ক বা ফাটা থাকলে এসব উপাদানে সমস্যা বাড়তে পারে। কোনো পণ্য ব্যবহারের পর ঠোঁটে জ্বালা বা অস্বস্তি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করা ভালো।
৬. পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য শারীরিক সমস্যা
কখনো কখনো আয়রন ও ভিটামিন বি-জাতীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির সঙ্গেও ঠোঁটের সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার অ্যালার্জি, একজিমা কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ঠোঁট শুষ্ক হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে শুধু আবহাওয়াকে দায়ী না করে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
‘
ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে যা করবেন
ঠোঁটের যত্নে খুব বেশি পণ্যের প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত কিছু অভ্যাস মেনে চললেই উপকার পাওয়া যেতে পারে।
- নিয়মিত লিপবাম ব্যবহার করুন: পেট্রোলিয়াম জেলি বা সেরামাইডযুক্ত সুগন্ধিবিহীন লিপবাম ব্যবহার করতে পারেন। দিনে কয়েকবার এবং রাতে ঘুমানোর আগে ঠোঁটে লাগানো ভালো।
- জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজাবেন না: ঠোঁট শুকিয়ে গেলে জিহ্বা না বুলিয়ে লিপবাম ব্যবহার করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন: দিনের বিভিন্ন সময়ে পানি পান করুন। শীতকালেও শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করা জরুরি।
- রোদ থেকে সুরক্ষা নিন: বাইরে যাওয়ার আগে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সুরক্ষাযুক্ত লিপবাম ব্যবহার করতে পারেন। দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে নিয়মিত আবার লাগাতে হবে।
- ঠোঁটের খোসা টানবেন না: শুকনো চামড়া দাঁত দিয়ে কামড়ানো বা আঙুল দিয়ে তুলে ফেলা থেকে বিরত থাকুন। এতে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং সারতে বেশি সময় লাগতে পারে।
- প্রসাধনী বাছাইয়ে সতর্ক থাকুন: ঠোঁটে জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন লিপবাম, লিপস্টিক বা অন্যান্য পণ্য ব্যবহার করবেন না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ শুষ্ক ঠোঁট নিয়মিত যত্নে ভালো হতে পারে। তবে ঠোঁট দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক ও খসখসে থাকলে, বারবার ফেটে গেলে কিংবা যত্ন নেওয়ার পরও উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঠোঁট ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত ব্যথা, লালচে ভাব বা ঘা তৈরি হলেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
মনে রাখতে হবে, ঠোঁটের শুষ্কতা সব সময় আবহাওয়া বা পানির ঘাটতির কারণে হয় না। তাই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে নিজে থেকে বিভিন্ন প্রসাধনী বা ওষুধ ব্যবহার না করে এর কারণ জানা জরুরি।











































