কারওয়া চৌথ কেন পালন করেন হিন্দু নারীরা?

সংগৃহীত ছবি

ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতিতে কারওয়া চৌথ একটি পরিচিত ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এদিন বিবাহিত নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনায় সূর্যোদয় থেকে চন্দ্রোদয় পর্যন্ত উপবাস করেন।সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার পর বিশেষ আচার পালনের মাধ্যমে উপবাস ভাঙেন তারা। তবে এই উৎসবের সূচনা ঠিক কবে, তা নিয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নেই।

উত্তর ভারত থেকে উৎসবের বিস্তার

ভারতের সরকারি পর্যটন ওয়েবসাইট ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’র তথ্য অনুযায়ী, কারওয়া চৌথ মূলত উত্তর ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানে বেশি পালিত হয়। ‘কারওয়া’ বলতে মাটির পাত্র এবং ‘চৌথ’ বলতে চান্দ্র মাসের চতুর্থ দিনকে বোঝানো হয়।কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থ তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়।

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নারীরা ভোরে খাবার খেয়ে উপবাস শুরু করেন। এরপর দিনভর খাবার ও পানি গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। সন্ধ্যায় চাঁদ ওঠার পর চালুনি দিয়ে চাঁদ দেখেন, চাঁদের উদ্দেশে প্রার্থনা করেন এবং পরে স্বামীর হাতে পানি পান করে উপবাস ভাঙেন।অঞ্চলভেদে আচার ও নিয়মে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

কিভাবে শুরু হয়েছিল এই উৎসব? 

কারওয়া চৌথের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। ২০১৬ সালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতীতে পুরুষেরা যুদ্ধ বা অন্য কাজে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনায় নারীদের প্রার্থনা ও উপবাসের রীতি গড়ে উঠতে পারে।

আরেকটি ব্যাখ্যায় উত্তর ভারতের কৃষিজীবী সমাজের সঙ্গে উৎসবটির সম্পর্কের কথা বলা হয়।ফসলের মৌসুম ও সামাজিক জীবনের নানা আচার থেকে এই উৎসবের কিছু রীতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসব ব্যাখ্যার কোনোটিকেই করওয়া চৌথের নিশ্চিত ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

লোককথায় রয়েছে বীরাবতীর গল্প

কারওয়া চৌথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীরাবতী নামের এক নারীর লোককথা। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বীরাবতী স্বামীর মঙ্গল কামনায় উপবাস করেছিলেন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে চাঁদ ওঠার আগেই চাঁদ ওঠার ভ্রম তৈরি করা হলে তিনি উপবাস ভেঙে ফেলেন। পরে স্বামীর বিপদের কথা জানতে পেরে তিনি অনুতপ্ত হন এবং প্রার্থনার মাধ্যমে স্বামীর জীবন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। কাহিনিটির বিভিন্ন সংস্করণ প্রচলিত রয়েছে। এটি ধর্মীয় লোককথা, যাচাই করা ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।

রাজস্থানে কারওয়া চৌথের আচার ও লোককথা নিয়ে গবেষণা করেছেন নৃতত্ত্ববিদ অ্যান গ্রডজিনস গোল্ড। তার ওয়েটিং ফর মুনরাইজ : ফাস্টিং, স্টোরিটেলিং, অ্যান্ড ম্যারেজ ইন প্রভিন্সিয়াল রাজস্থান গবেষণাটি ২০১৫ সালে ‘ওরাল ট্রেডিশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে রাজস্থানের নারীদের উপবাস, সম্মিলিত আচার এবং গল্প বলার ঐতিহ্যের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সময় বদলেছে, রয়ে গেছে উৎসবের তাৎপর্য

সময়ের সঙ্গে করওয়া চৌথের উদ্‌যাপনে পরিবর্তন এসেছে। এখন ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি নতুন পোশাক, মেহেদি, সাজসজ্জা এবং পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও উৎসবের অংশ। ভারতীয় সিনেমা ও টেলিভিশনেও এই উৎসবের উপস্থিতি এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

তবে কারওয়া চৌথের মূল তাৎপর্য এখনো স্বামীর মঙ্গল কামনা, দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি অঙ্গীকার এবং নারীদের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে যুক্ত। উৎসবটির উৎপত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত না থাকলেও লোককথা, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতির মধ্য দিয়ে এর ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।

LEAVE A REPLY