ছবিসূত্র : ফেসবুক থেকে নেওয়া।
অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর গাজায় শুরু হয়েছে প্রথম রমজান। বিধ্বস্ত গাজা শহরের ধ্বংসস্তূপ আর ভেঙে পড়া ভবনের মাঝেও রাস্তায় রাস্তায় টাঙানো ছোট ফানুস ও রঙিন বাতির মালা, যা ক্লান্ত মানুষের মনে একটুখানি স্বস্তি ও আশার আলো জ্বালিয়েছে। ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম মাসকে স্বাগত জানাতে সীমিত সামর্থ্যেও ফিলিস্তিনিরা চেষ্টা করছে উৎসবের আবহ ফিরিয়ে আনতে।
ঐতিহাসিক ওমারি মসজিদে কয়েক ডজন মুসল্লি প্রথম রমজানের ফজরের নামাজ আদায় করেন।
শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে ভারী জ্যাকেট গায়ে দিয়েই তারা নামাজে শরিক হন। গাজা শহরের বাসিন্দা আবু আদম বলেন, ‘দখলদারিত্ব, মসজিদ-স্কুল ধ্বংস আর আমাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও আমরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য এখানে এসেছি। গত রাতেও হামলা হয়েছে, তবুও আমাদের সংকল্প ভাঙেনি।’
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, বুধবার সকালে গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে একটি শরণার্থী শিবিরে গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আল-মাওয়াসি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ এখনো ত্রিপল ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে সময় লাগছে। তাবুতে বসবাসকারী নিবিন আহমেদ বলেন, ‘এই রমজান আনন্দের হলেও সেই আনন্দ যেন দমবন্ধ হয়ে আছে।
যারা শহীদ হয়েছেন, নিখোঁজ বা আটক আছেন, তাদের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছি।’
তিনি জানান, আগে রমজানের টেবিল ভরা থাকত নানা পদের খাবারে, আত্মীয়-স্বজনের কোলাহলে মুখর থাকত ঘর। এখন মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাবার জোগাড় করাই কঠিন। ইফতার বা সেহরিতে কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সামর্থ্য নেই। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সীমিত পণ্য প্রবেশ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে অধিকাংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
বাজারদর না কমায় জীবনযাত্রা এখনও অনিশ্চিত।
৩৭ বছর বয়সী মাহা ফাথি, যিনি গাজা সিটি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের পশ্চিমে তাবুতে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘সব ধ্বংস আর কষ্টের মাঝেও রমজান আমাদের জন্য বিশেষ। যুদ্ধের সময় সবাই টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল কিন্তু এখন মানুষ আবার একে অপরের কষ্ট অনুভব করতে শুরু করেছে।’
তিনি জানান, পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সেহরির প্রস্তুতি ও সামান্য সাজসজ্জা তাদের মনে কিছুটা হলেও আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে। ‘বাজারে কিছু সাজসজ্জা আর মানুষের চলাচল দেখলে মনে হয়, হয়তো স্থিতিশীলতা একদিন ফিরবে’।
গাজার মধ্যাঞ্চলে দেইর আল-বালাহ সমুদ্র সৈকতে ফিলিস্তিনি শিল্পী ইয়াজিদ আবু জারাদ বালুর ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ‘স্বাগতম রমজান’ লিখে উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছেন। পাশের তাবু শিবিরের শিশুরা তা কৌতূহলভরে দেখেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে গাজার প্রায় ২২ লাখ মানুষ অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তাবুতে বসবাসকারী ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-মাধুন বলেন, ‘আশা করি এটাই তাবুতে কাটানো আমাদের শেষ রমজান। সন্তানরা যখন ফানুস চায় বা পছন্দের খাবারে ভরা ইফতারের টেবিলের স্বপ্ন দেখে, তখন অসহায় লাগে। তবুও আমরা আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি।’
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সেহরি ও নামাজ আদায়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আনন্দটা এমন ছিল শিশুরা যেনো পিকনিকে এসেছে।’ ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাই রমজান গাজাবাসীর জন্য হয়ে উঠেছে আশা, সংহতি ও অটুট বিশ্বাসের প্রতীক।
সূত্র : জাপান টাইমস।











































