ইরানি শাসনব্যবস্থা কেন ভেঙে পড়েনি?

ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। অনেক ইরানি ভেবেছিলেন, হয়তো যুদ্ধ সেদিনই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি।

তারপরও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। প্রশ্ন হলো, সংঘাতের প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পরও লিবিয়া, সিরিয়া বা ইরাকের কিছু স্বৈরশাসনের মতো এই শাসনব্যবস্থা কেন ভেঙে পড়েনি?

এর প্রধান কারণ হলো ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া একটি জটিল শাসন কাঠামো। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে পুরো ক্ষমতা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে। ইরানে সর্বোচ্চ নেতা দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ।

এই পদটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তৈরি করা হয়।

একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ আজীবনের জন্য এই পদে নির্বাচিত করে। গোয়েন্দা সংস্থা, সেনাবাহিনীসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে নিয়োগ তার অনুমোদনের মাধ্যমে হয়।

ইরানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দুইজন সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

তবে ইরানের ক্ষমতা শুধু সর্বোচ্চ নেতার হাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী কাঠামো রয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

আইআরজিসির প্রভাব শুধু সামরিক নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ নয়, এর ক্ষমতা অনেক বিস্তৃত। চলমান সংঘাতে আইআরজিসির কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। কিন্তু সংস্থাটি বলেছে, কেউ নিহত হলেও তার জায়গায় নতুন কমান্ডার দ্রুত দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।

আইআরজিসি বাসিজ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনীও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় ১০ লাখ সদস্যের এই বাহিনীকে সাধারণত ভিন্নমত দমনের জন্য রাস্তায় মোতায়েন করা হয়। 

ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা বাসিজের কিছু চেকপয়েন্টে হামলা চালিয়েছে। তবে শহরগুলোতে এখনো বাসিজ সদস্যরা সক্রিয় আছে এবং গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। দেশের ভেতরে কর্তৃপক্ষ মানুষকে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ না করতে সতর্ক করেছে। এ জন্য সরকারি বিবৃতি ও গণহারে টেক্সট মেসেজ পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, ফলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত বড় কোনো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়নি। যদিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থকদের সমাবেশ দেখাচ্ছে। এদিকে মার্চের শুরুতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ইরানি গণমাধ্যমে কেবল তার কয়েকটি লিখিত বার্তা প্রকাশিত হয়েছে। ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথাও বলেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের নেতাদের পরিবর্তন করেছে এবং বিভিন্ন চেকপয়েন্টে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। নেতৃত্বের চেয়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই বেশি নিয়ন্ত্রিত বলে মনে হচ্ছে বলে বিশেজ্ঞরা বলছেন। 

ইরান তার দেশের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করা দিয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগই এখনো কোনোভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থাটি বিশ্বের অন্য অনেক সরকারের তুলনায় ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞ পরিষদ

বিশেষজ্ঞ পরিষদ এমন একটি সংস্থা, যার কথা আগামী দিনে বেশি শোনা যেতে পারে। এতে ৮৮ জন সদস্য রয়েছেন। তাদের প্রধান কাজ হলো দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন ও নিয়োগ করা। সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে নতুন নেতা বেছে নেওয়ার দায়িত্বও তাদের। তারা চাইলে কোনো সর্বোচ্চ নেতাকে অযোগ্য মনে করলে অপসারণ করতে পারে, তবে বাস্তবে তারা খুব কমই এ ধরনের হস্তক্ষেপ করে।

অভিভাবক পরিষদ

সর্বোচ্চ নেতার অধীনে অভিভাবক পরিষদ ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এতে ১২ জন সদস্য থাকে। এর মধ্যে ছয়জন ইসলামী ধর্মগুরু সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেন এবং ছয়জন আইনজ্ঞকে সংসদ নিয়োগ দেয়। এই পরিষদ সংসদে পাস হওয়া আইন পর্যালোচনা করে এবং তা ইসলামী আইন অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করে। এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনে কে প্রার্থী হতে পারবে, তাও তারা নির্ধারণ করতে পারে। ফলে ইরানের রাজনীতিতে তাদের বড় প্রভাব রয়েছে।

বিচার বিভাগ

ইরানের বিচার বিভাগ পরিচালনা করেন একজন প্রধান বিচারপতিকে সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেন। এই প্রতিষ্ঠান শুধু আদালত তত্ত্বাবধান বা অভিশংসক নিয়োগই করে না, বরং ইসলামী আইনের কঠোর ব্যাখ্যাও দেয়। এ কারণে সমাজের ওপর তাদের বড় প্রভাব রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি

বর্তমানে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান। রাষ্ট্রপতি প্রতি চার বছর পর পর নির্বাচিত হন। তিনি সরকার পরিচালনা করেন, মন্ত্রী নিয়োগ দেন এবং বাজেট প্রস্তাব করেন। তবে সংসদ সদস্যদের মতো তাকেও নির্বাচনে অংশ নিতে হলে আগে অভিভাবক পরিষদের অনুমোদন নিতে হয়।

এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল

এই পরিষদের কাজ হলো সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া। পাশাপাশি সংসদ ও অভিভাবক পরিষদের মধ্যে কোনো বিরোধ হলে তা সমাধান করাও তাদের দায়িত্ব।

ইরানি সেনাবাহিনী

আরতেশ নামে পরিচিত ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী রাজতন্ত্রের আমল থেকেই রয়েছে। তাদের প্রধান কাজ হলো দেশের সীমান্ত রক্ষা করা।

ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি)

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আইআরজিসি গঠন করা হয়। কারণ তখনকার নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি নিয়মিত সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না এবং আশঙ্কা করতেন তারা ক্ষমতাচ্যুত শাহের প্রতি অনুগত থাকতে পারে। আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান–ইরাক যুদ্ধের আট বছরে এই বাহিনী আকার ও শক্তিতে অনেক বড় হয়ে ওঠে।

নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী থাকার পাশাপাশি আইআরজিসি বাসিজ নামে একটি মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রায়ই প্রতিবাদ দমনে ব্যবহৃত হয়। তারা আইআরজিসির আন্তর্জাতিক শাখা কুদস ফোর্সও পরিচালনা করে। মধ্যপ্রাচ্যে হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে ইরানের রাজনীতিতে আইআরজিসির প্রভাব অনেক বেশি। সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে সাময়িকভাবে তিনজন মিলে তার দায়িত্ব পালন করেন—প্রধান বিচারপতি, রাষ্ট্রপতি এবং অভিভাবক পরিষদের একজন সদস্য।

LEAVE A REPLY