একটি কার্গো। একে ঘিরেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশ। সৌদি আরামকোর পাঠানো এলএনজিবাহী কার্গোটিকে ‘পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট। তাই এটি থেকে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি খালাসে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা।
সরকার বৈরী আবহাওয়ার ‘অজুহাত’ দিলেও মূলত এই আপত্তির কারণেই তিন দিন ধরে কার্গোটি বহির্নোঙরে ভাসছে। এতে গ্যাসের সরবরাহে ভয়াবহ ধস নেমেছে। শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বাসাবাড়িতে হাহাকার দেখা দিয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কমে দৈনিক ১৮৮ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আমদানি করা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এগুলো হলো-মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল এবং দেশীয় কোম্পানি সামিট গ্রুপের সামিট এলএনজি টার্মিনাল। দুটিই আবার পরিচালনা করে এক্সিলারেট। এলএনজি খালাস না হওয়ায় ২০ জুলাই যেখানে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, সেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় করা হয়েছে ১৮৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। ১০ বছর আগেও এর চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বুধবার এক্সিলারেট এনার্জির উপদেষ্টা এবং সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করে ওই কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু এক্সিলারেট থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে আরামকোর কার্গো সামিটের টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করে গ্যাস খালাস করা যাবে না। কারণ, এ ধরনের কার্গো এই টার্মিনালের জন্য প্রযোজ্য নয়।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তাহলে এ ধরনের কার্গোতে এলএনজি আমদানি করা হলো কেন। সরকারের পক্ষে এলএনজি আমদানিকারক রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, ২০২১ সালেও এ ধরনের কার্গোতে এলএনজি আমদানি করা হয়েছে এবং এক্সিলারেট সেই কার্গো থেকেই তা খালাস করেছে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, শনিবার বিটল এশিয়ার একটি এলএনজিবাহী কার্গো বাংলাদেশের জলসীমায় আসবে। সেটি হয়তো শেষ পর্যন্ত সামিটের টার্মিনালে সংযুক্ত করা হবে। এরপর কয়েকদিনের মধ্যে পুরোদমে চালু করতে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ২ থেকে ৩ দিনের জন্য বন্ধ করা হবে। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে।
বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই নাজুক। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের ঘটনার পর এই বিপর্যয় দেখা দেয়। সরবরাহ দৈনিক ২৬৫ কোটি থেকে কমে ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে ওই সময়। ৫ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির আংশিক চালু হলে সরবাহ কিছুটা বেড়ে ২৩৫ কোটি ঘনফুটে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন কার্গো বিতর্কের কারণে সেই সরবরাহ একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানি করা এলএনজি দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়। গত মাসের শেষে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার দরপত্র দিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কোনো উপায় না দেখে জি-টু-জির ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করে সৌদি কোম্পানি আরামকো থেকে মস টাইপ কার্গো জাহাজে করে এলএনজি আমদানি করা হয়। সাধারণত দুই ধরনের কার্গোতে এই এলএনজি পরিবহণ করা হয়-একটি মস টাইপ, অন্যটি মেমব্রেইন টাইপ।
বাংলাদেশ সাধারণত মেমব্রেইনে করেই এলএনজি আমদানি করে। কিন্তু এবার করল মস টাইপে। ১১ আগস্ট মধ্যরাতে আল হামরা নামে এই কার্গো বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। বলা হয়, তখন সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া দেখা দেয়। সাধারণত প্রতি সেকেন্ডে বাতাসের গতি ১৫ থেকে ২০ মিটার থাকলে কার্গোগুলো টার্মিনালের সঙ্গে সহজে সংযুক্ত হয়ে যায়। জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা জানান, এখন মাতারবাড়ীতে বাতাসের যে গতি তাতে অন্য জাহাজ সহজে টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। কিন্তু আরামকোর আল হামরা কার্গো সংযুক্ত করতে সবুজ সংকেত দিচ্ছে না এক্সিলারেট।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসলে বৈরী আবহাওয়া নয়, আরামকোর জাহাজকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে মার্কিন ওই কোম্পানি। এ কারণে জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বারবার অনুরোধ করেছেন এক্সিলারেটকে। এর জবাবে এক্সিলারেট জানিয়েছে, টার্মিনালটি সামিট গ্রুপের। তাই কোনো ঝুঁকি নিতে হলে সামিটকে নিতে হবে। এক্সিলারেট কোনো ঝুঁকি নেবে না।
এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিটের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, আল হামরা জাহাজটি তারা যাচাই করে দেখেছে। সেটি পুরোনো মডেলের এবং সামিটের টার্মিনালের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই এটি কোনোভাবেই খালাস করা যাবে না। তাছাড়া কোনো ধরনের এলএনজিবাহী কার্গো এখানকার টার্মিনালের জন্য প্রযোজ্য তার একটি তালিকা অনেক আগেই পেট্রোবাংলাকে দেওয়া হয়েছে। আরামকোর কার্গো ওই তালিকার মধ্যে পড়ে না। সুতরাং তারা জেনে-শুনে কেন এই কার্গো আনল।
এ বিষয়ে জানতে বারবার চেষ্টা করেও এক্সিলারেট এনার্জি কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বুধ ও বৃহস্পতিবার ইমেইল ও এসএমএস করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
সামিট এলএনজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েদুল আলমের সঙ্গে বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি প্রতিবেদককে পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন।
তবে আরপিজিসিএল-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্সিলারেট এনার্জি বা সামিটের এই তথ্য সঠিক নয়। কারণ, ২০২১ সালে ‘মারায়েহ’ নামে একই টাইপের কার্গো বাংলাদেশে এসে এলএনজি খালাস করে গেছে। এই এক্সিলারেটই তখন খালাস করেছে। এ প্রসঙ্গে আরপিজিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মন্তব্য নিতে বারবার যোগযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এখন কী হবে : বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সরকার এখনো এক্সিলারেটকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যাতে তারা আরামকোর পাঠানো ওই কার্গো থেকে খালাসের অনুমতি দেয়। যদি তা আজ-কালের মধ্যে না দেয়, তাহলে আগামীকাল বিটল এশিয়ার একটি কার্গো আসবে। সেটি সামিটের টার্মিনালে সংযুক্ত করা হবে। তখন গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে।










































