আন্তর্জাতিক জোটের আহ্বান, হরমুজ ঘিরে ঝুঁকির খেলায় আমিরাত?

ছবি: রয়টার্স

আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সহায়তা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এ জন্য দেশটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব আনার চেষ্টা করছে, যাতে প্রণালিটি খোলার পদক্ষেপ অনুমোদন দেওয়া হয়। 

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন আমিরাতি কর্মকর্তা জানান, ইউএইর কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও এশিয়ার সামরিক শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া যায়। ওই কর্মকর্তার মতে, ইরান মনে করছে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে এবং প্রণালিটির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বিশ্ব অর্থনীতিকেও চাপের মুখে ফেলতে প্রস্তুত তারা।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রণালিটি নিরাপদ রাখতে ইউএই কিভাবে সামরিকভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা তারা পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে সাগরে পাতা মাইন অপসারণ এবং অন্যান্য সহায়তামূলক কাজ করার বিষয়ও রয়েছে। কিছু আরব কর্মকর্তা বলেন, ইউএই মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত কিছু দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এর মধ্যে আবু মুসা দ্বীপও আছে।

এটি প্রায় ৫০ বছর ধরে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর মালিকানা দাবি করে।

এদিকে আমিরাত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে তাদের শহরগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিরুদ্ধে যে প্রস্তাব নিয়েছে, সেটির কথাও উল্লেখ করেছে। 

মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি।

এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ এখন ইরানের বর্তমান শাসনের বিরোধিতা করছে। 

তারা চায় যুদ্ধ চলতে থাকুক যতক্ষণ না এই শাসন দুর্বল বা অপসারিত হয়। তবে এসব দেশ এখনো তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে পাঠায়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাহরাইন জাতিসংঘে প্রস্তাবটির পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

পারস্য উপসাগরীয় একটি দেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যুদ্ধের আগে আমিরাতের কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টাও করছিলেন।

এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি আবুধাবি সফর করেছিলেন। পরে তিনি এক বিমান হামলায় নিহত হন। এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই আহ্বানের সঙ্গে একমত হচ্ছে, যেখানে মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধে আরো বেশি দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে সহায়তা করার জন্য।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন তিনি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা না হলেও যুদ্ধ শেষ করতে রাজি এবং বিষয়টি অন্য দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তবে প্রণালি খোলার কাজে আমিরাতের অংশগ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আরো কঠোর হয়ে উঠতে পারে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ইতিমধ্যে এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান আমিরাতের ওপর হামলা বাড়িয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে সীমিত আকারে হামলা চললেও সাম্প্রতিক দিনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মঙ্গলবার ইরান প্রায় ৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তেহরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের ভূখণ্ড দখলের যেকোনো প্রচেষ্টায় সমর্থন দেওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। বিশেষভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক এলিজাবেথ ডেন্ট বলেন, ‘যদি আমিরাত সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের আরো আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি হতে হবে।’ ইরান এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর প্রায় দুই হাজার ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাত এতদিন নিজেকে সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে দেখাতে এড়িয়ে চলছিল। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এখন দেশটির অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে আমিরাত ইরানকে শুধু কঠিন প্রতিবেশী হিসেবে দেখত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে দুবাইয়ের হোটেল ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইরানের হামলার কারণে আমিরাতের বিমান চলাচল ও পর্যটন কমে গেছে। এতে দেশের আবাসন বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ছুটি ও কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। ফলে দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক আকর্ষণগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এর জবাবে আমিরাত কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, ইরানি নাগরিকদের আর আমিরাতে প্রবেশ বা ট্রানজিট করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর আগে দুবাইয়ে ইরানি হাসপাতাল ও ইরানি ক্লাব বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

আমিরাতের নতুন অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার উদ্যোগে। এই প্রণালি দেশটির জ্বালানি রপ্তানি, জাহাজ চলাচল এবং খাদ্য সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলছেন, আমিরাত আশা করছে, এশিয়া ও ইউরোপের যেসব দেশ এখন দ্বিধায় আছে, তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পেলে প্রণালি পরিষ্কার করতে এগিয়ে আসবে। তবে রাশিয়া ও চীন এই প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারে। অন্যদিকে ফ্রান্স একটি ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবটি পাস না হলেও আমিরাত যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অংশ নিতে প্রস্তুত থাকবে। ইরান অবশ্য হরমুজ প্রণালিতে টোল ব্যবস্থা ও স্থায়ী তদারকির ওপর জোর দিচ্ছে।

আরব কর্মকর্তারা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, কোনো কূটনৈতিক সমাধান হলে তাতে জলপথের ওপর ইরানের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হতে পারে। তাই কেউ কেউ মনে করছে, আগে সামরিকভাবে ইরানকে দুর্বল করা প্রয়োজন।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সমুদ্রপথ নয়, প্রণালির আশপাশের প্রায় ১০০ মাইল এলাকা নিয়ন্ত্রণেও অভিযান চালাতে হতে পারে। এতে স্থলবাহিনীরও প্রয়োজন হতে পারে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য অ্যাডাম স্মিথ বলেন, এমন অভিযান সফল করা কঠিন। তার মতে, ইরানের শুধু একটি ড্রোন, একটি মাইন বা একটি ছোট আত্মঘাতী নৌকা ব্যবহারই প্রণালি হুমকির মুখে পড়বে। তবুও কিছু উপসাগরীয় দেশ মনে করে, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ যদি শত্রুভাবাপন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেই ঝুঁকি নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক এবং পেন্টাগনের সাবেক উপদেষ্টা বিলাল সাব বলেন, সামরিক অভিযানে যোগ দিলে তা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি আরব দেশগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন দেখাবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালী করবে।

এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি ঘাঁটিতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালির কাছেই। এটি দ্বীপ দখল বা বাণিজ্যিক ট্যাংকারগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ছোট কিন্তু সক্ষম বিমান বাহিনী রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা আগে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকে বিমান হামলায় অংশ নিয়েছিল। এ ছাড়া আমিরাতের কাছে নজরদারি ড্রোন, মার্কিন তৈরি বোমা এবং স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ আছে। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে।

থিঙ্ক ট্যাংক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গ্রান্ট রামলি বলেন, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান থাকার কারণে সেখানে বিভিন্ন সামরিক প্ল্যাটফর্ম একত্রে স্থাপন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা যাবে এবং উপসাগরের অপর পাশে থাকা ইরানের লক্ষ্যবস্তুগুলোতেও হামলা চালানো সহজ হবে।

LEAVE A REPLY