সংগৃহীত ছবি
প্রায় ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরেও ইরানের সঙ্গে পেরে না ওঠে তাদের অর্থনৈতিক চাপে ফেলতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের করা এই ‘যুদ্ধফাঁদে’ আটকা পড়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
একদিকে ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানি, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির বাড়তি ধাক্কার মধ্যে দিন দিন রিপাবলিকান দলের ভেতরেও বাড়ছে উদ্বেগ। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন আমেরিকান বলছেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে তাদের পারিবারিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে তীব্র জনঅসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি।
এ অবস্থায় চলমান এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জ্বালানির বাড়তি দাম ও জনঅসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ খুঁজছেন।বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমন তথ্য জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তা।
ঊর্ধ্বমুখী গ্যাসোলিন
এ পরিস্থিতিতে ফেডারেল গ্যাস কর সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ পদক্ষেপ কার্যকর হলে প্রতি গ্যালন জ্বালানিতে ১৮ সেন্ট পর্যন্ত দাম কমতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়ামের (গ্যাসোলিন) গড় মূল্য প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার ৫০ সেন্ট ছাড়িয়েছে।
রয়টার্সকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, জনগণকে দৃশ্যমান স্বস্তি দিতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ৪ ডলার অতিক্রম করাকে ঐতিহাসিকভাবে জনঅসন্তোষের গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে দেখা হয়।
রেকর্ড মূল্যস্ফীতি
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির ভোক্তা আস্থাও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গত মে মাসে করা রয়টার্স বা ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের বেশি মার্কিন নাগরিক বলছেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে তাদের পারিবারিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই জরিপে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অনুমোদনের হার নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে।
রাজনৈতিক উদ্বেগ
চলতি বছরের নভেম্বরে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। দলটির নেতারা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক চাপ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে এবং এতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দেশটির বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ কর হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলেছেন, জাতীয় গড় জ্বালানি মূল্য প্রতি গ্যালনে ৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছেন তারা।
কারণ ইতোমধ্যে দেশটির ৭টি অঙ্গরাজ্যে সেই সীমা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে আমেরিকান অ্যাকাউন্টিং অ্যাসোসিয়েশন।
হোয়াইট হাউসের এক রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন জ্বালানির দাম।
তিনি সতর্ক করে বলেন ,‘সামগ্রিক অর্থনীতি নয়, বরং গ্যাসের মূল্যই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আগেই অনুমান করেছিল এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়েছিল।
ঊর্ধ্বগতির ‘কিঞ্চিৎ মূল্য’
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বাধার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন খাতে।
মার্কিন বিমান সংস্থা থেকে শুরু করে ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছে। গত মার্চ মাসে মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি ব্যয় ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
তবে ট্রাম্প জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে ‘ছোট মূল্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই মূল্য দেওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা আমাকে একটুও প্রভাবিত করছে না। আমার কাছে একটাই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায়।’
ইরান যুদ্ধ সফল নাকি হুমকি?
ফেডারেল গ্যাস কর স্থগিতের প্রস্তাব বাস্তবায়নে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এ ধারণার প্রতি সমর্থন জানালেও দলীয় নেতৃত্ব এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
গত এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন রুশ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং অতিরিক্ত জ্বালানি পরিবহনের সুবিধার্থে কিছু শিপিং বিধিনিষেধ তুলে নেয়।
এ ছাড়া গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জাতীয় মজুদ থেকে আরও ৫ কোটি ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল ঋণ হিসেবে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
রয়টার্স বা ইপসোসের আরেক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল্য দেওয়া সার্থক হয়েছে। বিপরীতে ৫৩ শতাংশ মনে করেন, এই যুদ্ধ মূল্যবান নয়।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ অ্যামি কচ রয়টার্সকে বলেন, ‘মানুষ হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক চাপ মেনে নিতে প্রস্তুত, যদি এতে ইরান ইস্যুর সমাধান হয়।’
কিন্তু হোয়াইট হাউসের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।









































