ইংরেজি একটি প্রবাদ আছে-‘তোমার গন্তব্য যদি দুই মাইল দূরে হয়, তবে তুমি তিন মাইল হাঁটার প্রস্তুতি নাও-তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।’ সরকারও বাজেট বাস্তবায়নে যেন এই নীতির পথেই হাঁটে। প্রতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। যার বোঝা বইতে না পারায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার তখন ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে বেকারত্ব বাড়ে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। অথচ রাজস্ব আদায়ের হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য আদতে বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নযোগ্য কিনা-এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি শুধু রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, বরং পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা সচল থাকে তার ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, কর অবকাশ, করহার যৌক্তিকীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার চেষ্টা চলছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাত সক্রিয় হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং রাজস্ব স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে চাপ, খেলাপি ঋণ এবং আস্থার সংকট উৎপাদন, ভোগ ও বিনিয়োগ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সঙ্গত কারণে করভিত্তি সম্প্রসারণ ছাড়া শুধু করহার বা লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে রাজস্ব আহরণে চাপ থেকেই যাবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এনবিআরের রাজস্ব আদায় প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বাস্তব পরিস্থিতিতে অর্জন করা অসম্ভব। এজন্য এ চিন্তাকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসাবে দেখা হচ্ছে।
এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা হিসাবে কর অব্যাহতিকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, কর অব্যাহতির পরিধি দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছে। এতে কর ব্যয়ের চাপও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে একদিকে রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি যেমন তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কর ছাড়ের মাধ্যমে রাজস্ব ভিত্তি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রস্তাবিত বাজেটে যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে সামনে আসেনি।
বাজেটে ব্যবসার ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ থাকলেও ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার নিয়ে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। অথচ আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির জন্য এই সংস্কারকে অত্যন্ত গুরুত্বত্বপূর্ণ হিসাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
করভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সব ভ্যাট ও আয়কর নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে রিটার্নে প্রতিফলিত নিশ্চত করা। এতে কর ফাঁকি কমার পাশাপাশি কর ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়বে।
বর্তমান বাস্তবতায় কর আহরণের সম্ভাবনা থাকলেও প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে রয়ে গেছে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করে তুলেছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবছরই উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবে অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে, ফলে শেষ প্রান্তিকে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে প্রকৃত রাজস্ব ভিত্তির তুলনায় প্রবৃদ্ধির চাপ অনেক বেশি। উৎপাদনশীলতা না বাড়লে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, করভিত্তির সীমাবদ্ধতার অন্যতম কারণ করের পরিধি বাড়াতে না পারা। দেশে ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি ব্যবসা ইউনিট থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৮ লাখের নিচে। আয়করদাতার সংখ্যাও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে গতি কমেছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পেয়েছে এবং কার্যকরী মূলধনের প্রবাহেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করজাল এখনো যথেষ্ট বিস্তৃত হয়নি এবং এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন ও কাঠামোগত সংস্কারও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন খুবই কঠিন হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের (সিআই) রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট সরকার জনতুষ্টিমূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন করছাড়ের ঘোষণা শুনতে ভালো লাগলেও সমস্যা হবে বাজেট বাস্তবায়নের অর্থায়ন নিয়ে। তিনি বলেন, অনেক খাতে কর কমানোর কথা বলা হয়েছে। যেমন ব্যক্তিগত করহার যৌক্তিক রাখা হয়েছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর কমানো হয়েছে এবং জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎসহ বেশকিছু জরুরি খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, এত খাত থেকে কর কমানো হলে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট, সবচেয়ে বেশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় এবং নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের অর্থ আসবে কোথা থেকে। এর উত্তরে বলা হচ্ছে করের আওতা ও আদায় বাড়ানো হবে, কর ব্যবস্থা সহজ, আধুনিকায়ন করা হবে, কমানো হবে দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি বন্ধ করা হবে। কিন্তু এই উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধি না হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেবে অথবা বিদেশি ঋণের দিকে যেতে পারে।










































