ঢাকা-আশুলিয়া অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : ব্যয়ে শীর্ষে, সুবিধায় পিছিয়ে

ফাইল ছবি

অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়াল সড়ক এখন সব দেশের সড়কব্যবস্থা সহজ ও যাতায়াতব্যবস্থা দ্রুত করার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ঢাকা-আশুলিয়া অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় ২৪ কিলোমিটার উড়ালপথ করছে বাংলাদেশ।অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে অন্য দেশগুলোর তুলনায় খরচ বেশি হচ্ছে। তবে অন্য দেশের কম খরচে নির্মিত উড়াল সেতুগুলোতে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি।

চীনের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বেশির ভাগ কাজ শেষের পর ব্যয় এক লাফে ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।গত ২২ জুলাই (বুধবার) সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়।

বিদেশি ঋণে নির্মিত হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ‘ঢাকা-আশুলিয়া’। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালসড়কের নির্মাণ ব্যয় ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ব্যয়ের দিক দিয়ে এটি বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে। এ প্রকল্পের ডিপিপি পাস হয় ২০১৭ সালে। ঠিকাদারের সঙ্গে চায়না কমার্শিয়াল লোনের চুক্তি হয়েছে ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে। এরপর শুরু হয় নির্মাণকাজ।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা; এর মধ্যে চীনের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে ওই বছর জুনেই প্রকল্প প্রস্তাবে প্রথম সংশোধনী আনা হয়।

এতে প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে ওই সময় চীনের অর্থায়নের পরিমাণ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। সবশেষ গত বুধবার একনেকে এ প্রকল্পের ব্যয় ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাড়ল এক লাফে ৫৪ শতাংশ টাকা।

এতে সরকারের সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা এবং চীনের অর্থায়ন ৩৭ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

একনেক কমিটির বৈঠক শেষে এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির কাছে। তিনি তখন বলেন, এখানে আসলে ঢাকা-আশুলিয়া যে প্রকল্পের খরচটা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে, তার দুটো কারণ আছে।
একটা হচ্ছে মূলত ডলার রেট একটা বড় আকারে পরিবর্তন ঘটেছে। সেই ডলারের পরিবর্তনের কারণেই আবার কতগুলো ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের জায়গা আছে।”

অপর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এখানে নতুন একটা অঙ্গ সংযোজন হয়েছে। তো সেই অঙ্গ সংযোজনের ফলেও খরচের একটি বৃদ্ধি আছে। আর কিছু ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, যেটা মূল ডিপিপিতে সেখানে ছিল না—যার ফলে ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরে একটা খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর পাঁচটি নতুন অঙ্গ সংযোজনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুটোই আসলে মূলত খরচ বৃদ্ধি। বাকিটা মূলত ডলারের রেট সমন্বয় এবং তদঅনুযায়ী যে ভ্যাট-ট্যাক্সের হিসাব, সেটা।

অন্য দেশের অ্যালিভেটের এক্সপ্রেসওয়ে

চলতি বছর পুরোদমে চালু হয়েছে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে নির্মিত ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে। ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এলিভেটেড (উড়ালপথ)।

দুর্গম এলাকা হওয়ায় এক্সপ্রেসওয়েটির জন্য বিপুলসংখ্যক ছোট-বড় সেতু এবং পাহাড় কেটে টানেল বানাতে হয়েছে। দুর্গম পাহাড় আর উপত্যকাঘেরা এলাকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি এক্সপ্রেসওয়েটিকে চীনের ব্যয়বহুল মহাসড়কে পরিণত করেছে। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ২০০ মিলিয়ন ইউয়ান, বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা ৩৬৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ।

বাংলাদেশি মুদ্রায় কিলোমিটারপ্রতি ৬৩০ কোটি টাকা খরচ করে দামনসারা-শাহ আলম অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ড্যাশ) নির্মাণ করেছে মালয়েশিয়া। এ উড়ালসড়ক আধুনিক অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে আলোচিত। যানবাহন চলাচল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াও এতে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নয়েজ ব্যারিয়ারের মতো সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে। মাল্টি-লেন ফ্রি ফ্লো (এমএলএফএফ) টোল ব্যবস্থার সঙ্গে ১৩টি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হয়েছে এ এক্সপ্রেসওয়েতে।

ভারতের প্রথম আট লেনের অ্যালিভেটেড মহাসড়ক দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অব ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটির প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় ২৫০ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বিমানবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এ সুবিধা নিশ্চিত করতে নির্মিত হয়েছে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আট লেনের সুড়ঙ্গ, যা ভারতের অন্যতম প্রশস্ত নগর (আরবান) টানেল হিসেবে বিবেচিত।

কিলোমিটারপ্রতি ৮৩৭ কোটি টাকা খরচে পোর্ট অ্যাকসেস অ্যালিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণ করছে শ্রীলঙ্কা। কিলোমিটারপ্রতি ৩৯০ কোটি টাকায় শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়ে নির্মাণ করেছে ইন্দোনেশিয়া। রামা ৩ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে থাইল্যান্ড কিলোমিটারপ্রতি ৬১২ কোটি টাকা ব্যয়ে। এ প্রকল্পগুলোর অবকাঠামোগত সুবিধা চীন, মালয়েশিয়ায় নির্মিত এক্সপ্রেসওয়েগুলোর মতোই। 

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ব্যয়ের দিক দিয়ে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ হলেও এর অবকাঠামোগত সুবিধা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হচ্ছে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশি হলেও সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণমান, পরিবেশগত সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উন্নত ও উদীয়মান দেশগুলো অবকাঠামো নির্মাণে শুধু মূল নির্মাণ ব্যয় নয়, পরিবেশগত শর্ত পূরণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকেও প্রকল্পের মূল বাজেটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হলেও বাস্তবায়নের সময় তার কার্যকর প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতি রয়ে যায়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও আমরা এমন অবকাঠামো পাচ্ছি, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।’

সূত্র : বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY