সংগৃহীত ছবি
ঢাকার কাফরুলে ময়লার ব্যবসা, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। নগরের সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন খাতে অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিপজ্জনক যোগসূত্র এখনো বহাল রয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সেটিরই একটি প্রমাণ।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এসব কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে এ ঘটনার পেছনে নগরসেবাকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় আধিপত্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। আইপিডি বিশ্বাস করে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নগরভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি বিপজ্জনক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বহাল রয়েছে, যেখানে দলীয় পদ-পদবি ও রাজনৈতিক পরিচয়কে অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার পরিবর্তে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।ফলে রাজনীতির সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্যের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক এই অপসংস্কৃতির অবসান হবে বলে গণ আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু সেটা যথাযথভাবে পূরণ হয়নি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ময়লা সংগ্রহ, ফুটপাত, বাজার, পরিবহন, মাঠ-পার্ক, খাল-জলাশয়-জমি দখলসহ বিভিন্ন নগরসেবাকে কেন্দ্র করে একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।এই অবৈধ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বলয়ের অভ্যন্তরেও সংঘাত, সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ড ঘটছে।’
আইপিডি জানায়, ঢাকা শহরে ময়লা ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে যে বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা বহুদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। নাগরিকরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করার পরও তাদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ময়লা অপসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এটা নিয়ে কোর্টে ইতিমধ্যে রিটও করা হয়েছে।
এই অস্বচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চাঁদাবাজি এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।অথচ সিটি করপোরেশন চাইলে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণ প্রক্রিয়া সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে পারে এবং অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেও এই স্বার্থান্বেষী চক্র ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ দীর্ঘদিন দেখা যায়নি।
একই ভাবে ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নগর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এই দখলদারিত্ব বছরের পর বছর টিকে থাকে। এর ফলে একদিকে নাগরিকদের চলাচল, পরিবেশ ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানায় আইপিডি।
আইপিডি মনে করে, সিটি করপোরেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবৈধ গোষ্ঠী আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
আইপিডির মতে, কাফরুলের হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং এই ধরনের সংঘাতের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে দিতে হবে। অবৈধ অর্থনীতির উৎস বন্ধ না করলে ব্যক্তি পরিবর্তিত হবে, কিন্তু সহিংসতার চক্র অব্যাহত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে নগরের সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন খাতে অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবকে নির্মূলের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইপিডি সরকারের প্রতি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। সেগুলো হচ্ছে—
১. রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
২. রাজনৈতিক দলগুলোর যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
৩. ময়লা সংগ্রহ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আনা এবং নাগরিকদের কাছ থেকে অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করা।
৪. ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখলমুক্ত করতে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. নগরসেবাভিত্তিক সব ইজারা, চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা।
৬. সিটি করপোরেশনে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নগর প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি জোরদার করা।
৭. নগর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অবৈধ অর্থনীতি ও এতদসংশ্লিষ্ট অপরাধীদের চিহ্নিত করে তা নির্মূলে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং এই বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা।
আইপিডি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে দখলদারিত্বের পালাবদলের ঘটনাসমূহ আমাদের শহরকে আরো বিপন্ন করে তুলছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ও অনেক। নগরসেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে হলে প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। অন্যথায় নগরের বিভিন্ন সেবা ও সম্পদ দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে এবং একটি নিরাপদ, সুশাসিত ও বাসযোগ্য ঢাকা মহানগরী গড়বার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।











































