মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু বা ‘নার্ভ সেন্টার’ লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ থেকে জুনের মধ্যে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিটি বারবার হামলার শিকার হয়। পেন্টাগন প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, স্যাটেলাইট চিত্র, সোশ্যাল মিডিয়ার ফুটেজ এবং সাবেক ও বর্তমান সেনাসদস্যদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের এই হামলায় মার্কিন ঘাঁটির কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স (প্রধান কার্যালয়) এবং অন্তত এক ডজন ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রিয়েল-টাইম সামরিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন টার্মিনাল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার।
মার্কিন সামরিক বাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, এই হামলায় ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ নামের ওই ঘাঁটিতে কেউ নিহত হয়নি এবং ঘাঁটির কার্যক্রমে কোনো বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বেশিরভাগ কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হলেও বর্তমানে কেবল একটি ছোট দল সেখানে মোতায়েন রয়েছে।
উল্লেখ্য, পেন্টাগন এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ মার্কিন কংগ্রেসের কাছে প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২.২ বিলিয়ন থেকে ৫.১ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে শুধু বাহরাইনের এই ঘাঁটিটি পুনর্নির্মাণ করতেই প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই নজিরবিহীন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাহরাইনে অবস্থান করা এই ঘাঁটিটি ইরানের আধুনিক সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করছে:
ঘাঁটি স্থানান্তর: কুয়েত এবং সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে পশ্চিম দিকে ঘাঁটি বা ঘাঁটির কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া।
ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার: নতুন করে ভবন তৈরি না করে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল নোডগুলো মাটির নিচে বা আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া।
ইসরাইলকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা: নতুন ঘাঁটি বা সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসরাইলকে অন্যতম সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরাইল ডজনখানেক মার্কিন যুদ্ধবিমান ও রিফুয়েলিং প্লেনকে জায়গা দিয়েছিল।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইনের রাজা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের নিরাপত্তার প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত সফর করলেও সৌদি আরব সফর এড়িয়ে গেছেন। মূলত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সৌদি আরব মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে রিয়াদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা আমেরিকার এই অঞ্চলের রণকৌশল পুনর্মূল্যায়নকে আরও তরান্বিত করেছে।
সাবেক বিমান বাহিনীর সহকারী সেক্রেটারি ডক্টর রবি চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আমাদের স্থাপনাগুলো সাহসিকতার সঙ্গে রক্ষা করেছি, কিন্তু যেসব যুদ্ধাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে, তা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোকে আঘাত করেছে। এটি গত ১০ বছর ধরে ইরানের স্ট্রাইক টেকনোলজির পরিধি ও নির্ভুলতা বাড়ানোরই ফল।’
বাহরাইনের এই ঘাঁটিটি একসময় মার্কিন সেনাদের বিনোদন ও পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য একটি ছোট আমেরিকান শহরের মতো কাজ করত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি মার্কিন উপস্থিতির ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমেরিকা এখন কী পুনর্নির্মাণ করবে, কী পরিত্যাগ করবে এবং কতখানি পিছিয়ে যাবে—সেই সিদ্ধান্তের ওপরেই আগামী প্রজন্মের মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল











































