রাশিয়া কেন ভারত থেকে পেট্রল আমদানি করছে?

ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। দেশটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি বিদেশে বিক্রি করে।কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে এবার রাশিয়াকেই ভারত থেকে পেট্রল আমদানি করতে হচ্ছে।

অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশের চাহিদা মেটাতে রাশিয়া বিদেশ থেকে পরিশোধিত পেট্রল কিনছে। এর প্রধান কারণ, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিউইয়র্কভিত্তিক আর্থিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, গত ৫ আগস্ট ভারতীয় তেল শোধনকারী প্রতিষ্ঠান নায়ারা এনার্জি লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ৪২ হাজার ব্যারেল পেট্রল পেয়েছে রাশিয়া।মস্কোর জন্য এটি ভারত থেকে পেট্রল আমদানির প্রথম চালান বলে জানা গেছে।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এই চালান নিয়ে রাশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ ‘সাইক্লোন’ ১৮ জুন গুজরাটের ভাদিনার বন্দর ছাড়ে। জাহাজটির আগের নাম ছিল ‘অগ্নি’। পরে ৬ জুলাই মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের দামিয়েত্তা বন্দরে পেট্রল অন্য একটি জাহাজে তোলা হয়।ওমানের পতাকাবাহী ‘গারনেট’ নামের জাহাজটি এরপর জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ার দিকে যায় এবং আগস্টের শুরুতে সেখানে পৌঁছায়। তবে এটিই একমাত্র চালান নয়। 

জুলাই মাসে আরো অন্তত দুটি জাহাজ ভাদিনার বন্দরে এসে পেট্রল নিয়ে মিসরের একটি বন্দরের দিকে যায়। সেখানেও জ্বালানি অন্য জাহাজে তোলা হয়। এসব জাহাজ রাশিয়ার দিকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।এর আগে রয়টার্সও শিল্প খাতের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, রাশিয়া সমুদ্রপথে পেট্রল আমদানি শুরু করেছে। একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে অন্তত ৬০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রল রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। আরো দুটি ট্যাংকারে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন করে জ্বালানি পাঠানো হয়েছে বলে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে।

রাশিয়ার কাছে বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে। দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক এবং তৃতীয় বৃহত্তম পরিশোধিত তেলজাত পণ্য রপ্তানিকারক। তারপরও দেশটিতে পেট্রলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ ইউক্রেনের ড্রোন হামলা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেন দীর্ঘপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে আসছে। ২০২৪ সালে এসব হামলা শুরু হলেও ২০২৬ সালে তা আরো বেড়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অন্তত ১৬টি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে আরো অন্তত ১৫টি শোধনাগার ও বড় তেল পরিশোধন স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে মস্কোর একটি তেল শোধনাগারও রয়েছে। এটি ক্রেমলিন থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। এ ছাড়া জুলাই ও আগস্টে ওমস্ক, রিয়াজান ও অরস্কের মতো শহরের বড় তেল শোধনাগারেও হামলা হয়েছে।

এসব হামলার ফলে অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রল, ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তৈরির রাশিয়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্লুমবার্গের উদ্ধৃত এনার্জি অ্যাসপেক্টসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে রাশিয়ার শোধনাগারগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করেছে। আগের বছরের গড়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রতিদিন ১৪ লাখ ব্যারেলের বেশি কম। ২০০৫ সালের মার্চের পর এটিই রাশিয়ার সর্বনিম্ন দৈনিক তেল পরিশোধনের হার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাশিয়ার মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল থাকলেও সেই তেলকে পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তর করার সক্ষমতা কমে গেছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় রাশিয়া নিজের দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। দেশটি পেট্রল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত করেছে। ডিজেল রপ্তানির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার কয়েকটি এলাকায় এবং দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপে জ্বালানি রেশনিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। সমস্যাটি আরো তীব্র হয়েছে গ্রীষ্মকালে, যখন দেশটিতে পেট্রলের চাহিদা বেড়ে যায়

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালে রাশিয়ায় প্রতিদিন পেট্রলের ব্যবহার ১ লাখ ১০ হাজার টনের বেশি হয়ে যায়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ সময় জ্বালানির চাহিদা বেশি থাকে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও জুনের শেষ দিকে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন। সরকারি মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে কিছু অঞ্চলে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাশিয়া পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতেই রাশিয়া ভারতসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেট্রল আমদানি শুরু করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে রাশিয়া অন্তত তিনটি দেশ থেকে পেট্রল আমদানি করেছে। এর মধ্যে বেলারুশ ও কাজাখস্তান থেকে স্থলপথে জ্বালানি এসেছে। ভারত থেকে এসেছে সমুদ্রপথে। রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৪ লাখ টন পেট্রল আমদানির পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। বেলারুশও রাশিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়েছে। রয়টার্সের হিসাব ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথমার্ধের তুলনায় জুনের প্রথমার্ধে বেলারুশ থেকে রাশিয়ায় রেলপথে পেট্রল সরবরাহ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ওই সময়ে ৭০ হাজার টনের বেশি পেট্রল পাঠানো হয়। ব্লুমবার্গকে জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রধান বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন, ভারত থেকে রাশিয়ায় পেট্রল যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, বেলারুশ ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি ভারত থেকেও পেট্রল আনা হচ্ছে। এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরে পেট্রলের সংকট কতটা গুরুতর, তার একটি বড় উদাহরণ। ভারত থেকে রাশিয়ায় পাঠানো পেট্রলের চালানগুলো নায়ারা এনার্জি থেকে এসেছে বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ। গুজরাটের ভাদিনারে ভারতের অন্যতম বড় তেল শোধনাগার পরিচালনা করে নায়ারা এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি রোসনেফট নায়ারা এনার্জির ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ফলে রাশিয়ার নিজস্ব তেল শোধনাগারগুলো ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থেকেই দেশটিতে পেট্রল পাঠানো হচ্ছে।

ঘটনাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ভারত নিজেই তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। তারপরও এখন দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্যে অস্বাভাবিক একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনছে, আবার রাশিয়া ভারত থেকেই পরিশোধিত পেট্রল কিনছে। ব্লুমবার্গের উদ্ধৃত কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়া থেকে রেকর্ড ২৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এটি ওই মাসে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, রাশিয়া থেকে ভারতে অপরিশোধিত তেল যাচ্ছে বিপুল পরিমাণে। আর সেই তেল পরিশোধন করে তৈরি করা জ্বালানির একটি অংশ এখন আবার রাশিয়াতেই পাঠানো হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের এই অস্বাভাবিক চিত্র তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার বিপুল তেলের মজুত রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দেশটির তেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেল থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পেট্রল তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক রাশিয়াকে এখন বিদেশ থেকে পেট্রল কিনতে হচ্ছে। আর সেই পেট্রলের প্রথম চালানগুলোর একটি এসেছে ভারত থেকে, যে দেশটি নিজের প্রয়োজনের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করে।

LEAVE A REPLY