ছবি : রয়টার্স
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় টাইফুনটি শুক্রবার অঞ্চলটির দিকে ধেয়ে আসায় ফিলিপাইনে ভূমিধসে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাইওয়ানে শত শত মানুষকে তাদের বাড়িঘর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
টাইফুন ‘বাভি’ আজ শুক্রবার ও শনিবার তাইওয়ানের উত্তর ও পূর্ব এবং জাপানের প্রত্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হানার পর চীনে আছড়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বাভির প্রভাবে সৃষ্ট ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ মিন্দানাওতে ভূমিধসে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরো ছয়জন নিখোঁজ হয়েছেন। শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ আঘাত হানার আশঙ্কায় তাইওয়ানের বন্দরনগরী কিলুংয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার মজুদ করছেন, জানালায় টেপ লাগাচ্ছেন এবং দোকানের সামনে বালির বস্তা রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছেন।
কিলুংয়ের ৭৬ বছর বয়সী মুদি দোকান মালিক চ্যাং শি-হুও বলেন, টাইফুনটি খুব শক্তিশালী হবে বলে জানানো হয়েছে। তাই তারা ইনস্ট্যান্ট নুডলস, রুটি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাবার মজুদ করেছেন। আবহাওয়া আরো খারাপ হলে দোকান বন্ধ করে দেবেন বলেও জানান তিনি।
গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানাসে সুপার টাইফুন হিসেবে আঘাত হানার পর প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় বাভির শক্তি কিছুটা কমেছে।তাইওয়ানের সেন্ট্রাল ওয়েদার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিডব্লিউএ) জানিয়েছে, শুক্রবার টাইফুনটির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৯৮ কিলোমিটার।
আবহাওয়াবিদ ওয়াং পিং-হসিয়াং জানান, অনুকূল পরিবেশ না থাকায় টাইফুনটি কিছুটা দুর্বল হতে পারে। তবে তাইপে, নিউ তাইপে, কিলুং ও ইলান এলাকায় এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া মধ্য ও উত্তর তাইওয়ানের পার্বত্য অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাভির শক্তিশালী বাতাসের বিস্তৃতি প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার।ফলে এটি গত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় টাইফুনগুলোর একটি হতে পারে।
টাইফুন ‘বাভি’র প্রভাবে শুক্রবার রাজধানী তাইপেইসহ উত্তর ও পূর্ব তাইওয়ানের অনেক স্কুল, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শত শত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। কিলুং শহরে মানুষ প্রয়োজনীয় ফল ও সবজি কিনতে বাজারে ভিড় করছেন। রাস্তার দোকানিরা তাদের দোকান নিরাপদ করার কাজ করছেন।
কিলুংয়ের রেস্তোরাঁ মালিক পেনি প্যান বলেন, গত ১০ বছরে এমন পরিস্থিতি তারা দেখেননি। তিনি জানান, আগে কখনো টাইফুনের জন্য বালির বস্তা ব্যবহার করতে হয়নি। তবে এবার শক্তিশালী দমকা হাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় জেলে ও নৌযানচালকদের পরামর্শে তারা অতিরিক্ত সতর্কতা নিচ্ছেন।
‘প্রবল বাতাস ও ভারি বৃষ্টি’
টাইফুন ‘বাভি’র প্রভাবে তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য হুয়ালিয়েন কাউন্টির বাসিন্দা। সেখানে দুটি বাঁধে সার্বক্ষণিক নজর রাখছে কর্তৃপক্ষ।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিংতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও যানবাহনসহ ২০ হাজারের বেশি সেনাসদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিউ তাইপেই সিটির উপকূলীয় এলাকা বালির একটি নুডলসের দোকানের কর্মী স্যামুয়েল ফু বলেন, দোকান চালু হওয়ার পর এই প্রথম এতো বড় টাইফুনের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানান তিনি।
জাপানের প্রত্যন্ত সাকাশিমা দ্বীপপুঞ্জের দিকে টাইফুন বাভি এগিয়ে আসায় কিছু এলাকায় স্কুল ও অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া কর্মকর্তারা উঁচু ঢেউ, প্রবল ঝড় ও ভূমিধসের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। মিয়াকো দ্বীপের একটি হোটেলের কর্মী মাসারু নাকামুরা জানান, ঝড়ের ক্ষতি এড়াতে তারা বিভিন্ন জিনিসপত্র জাল দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। তিনি বলেন, ঝড়টি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
ওকিনাওয়ার বাসিন্দা কোকি ওহামা বলেন, ঝড়ের কারণে নাহা শহরে তার ওয়াটার স্পোর্টস ও বারবিকিউ ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। ৩০ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী জানান, সপ্তাহান্তের জন্য আগে থেকেই সব বুকিং ছিল, কিন্তু ঝড়ের কারণে সব বাতিল হয়ে গেছে। জাপানের দ্বীপপুঞ্জ ও তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চল অতিক্রম করার পর টাইফুন বাভি সপ্তাহান্তে পূর্ব চীনের উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, চীনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে চলতি সপ্তাহের বৈরী আবহাওয়া ইতোমধ্যেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। ঝড় ও বন্যায় অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, অনেক নদী উপচে পড়েছে এবং একটি জলাধারের বাঁধ ভেঙে গেছে।
গত সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিস জানিয়েছে, বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে সমুদ্রের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
সমুদ্রের পানি বেশি উষ্ণ হলে ক্রান্তীয় ঝড় শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বাতাসে বেশি আর্দ্রতা যোগ করে। এর ফলে ঝড়ের সময় ভারি বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এদিকে, এ বছর আবারও এল নিনো ফিরে এসেছে। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা যায়।











































