সংগৃহীত ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙনের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজ্যসভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তৃণমূলের ৩ সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিয়েছেন।
তারা হলেন সুশ্মিতা দেব, সুখেন্দু শেখর রায় ও প্রকাশ চিক বরাইক। গতকাল বৃহস্পতিবার বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলটি তাদের শূন্য হওয়া তিনটি রাজ্যসভা আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করে। আগামী ২৪ জুলাই এসব আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূলে ভাঙন ধরানোর বিজেপির পরিকল্পনা এখানেই শেষ নয়।তৃণমূলের আরেক রাজ্যসভা সদস্য রুক্মিণী মল্লিক ইতোমধ্যে ই-মেইলে রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন এবং শিগগিরই সরাসরি সাক্ষাৎ করে তা জমা দেবেন।
এ ছাড়া দলটির অবশিষ্ট রাজ্যসভা সদস্যদের মধ্য থেকে আরো দুজন বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন বলে দাবি করেছে সূত্র।
তৃণমূল তত্ত্ব
তৃণমূলের সাবেক নেতাদের দলে নেওয়ার বিষয়ে বিজেপির আগের অবস্থানের সঙ্গে নতুন সিদ্ধান্তের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের দলে না নেওয়ার কথা বললেও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি সমীক ভট্টাচার্য এই তিন নেতাকে দলে নেওয়াকে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।যদিও এর আগে তিনি ‘ভালো তৃণমূল’ ও ‘খারাপ তৃণমূল’ তত্ত্বও তুলে ধরেছিলেন।
রাজ্যসভায় বিজেপির শক্তি বাড়ছে
রাজ্যসভায় ভাঙনের আগে তৃণমূলের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৩। দলত্যাগ করে সরাসরি দল ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা (৯ জন) না পাওয়ায় বিজেপি পদত্যাগ করিয়ে নিজেদের প্রতীকে পুনর্নির্বাচিত করার কৌশল নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে একদিকে তৃণমূলের শক্তি কমছে, অন্যদিকে রাজ্যসভায় বিজেপির অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
২৪ জুলাইয়ের উপনির্বাচনের পর রাজ্যসভায় বিজেপির সদস্যসংখ্যা বেড়ে ১১৭-এ পৌঁছাবে, যা দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।এককভাবে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (১২৩ জন) জন্য তখন তাদের প্রয়োজন হবে মাত্র ছয়টি আসন।
এর সঙ্গে সাতজন মনোনীত সদস্য এবং তিনজন স্বতন্ত্র সদস্য (পরিমল নাথওয়ানি, কার্তিকেয় শর্মা ও দিলীপ রায়) সমর্থন দিলে বিজেপির সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৭ জনে, যা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করবে। মিত্রদের নিয়ে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (১৬৪ জন) আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
বর্তমানে বিজেপির জোটসঙ্গীদের রাজ্যসভায় মোট ২৬ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি), এআইএডিএমকে, জনতা দল (ইউনাইটেড) এবং এনসিপির চারজন করে সদস্য রয়েছেন। শিবসেনা ও ইউপিপিএলের দুজন করে সদস্য এবং আরপিআই (এ), এজিপি, এমএনএফ, এনপিপি, আরএলএম ও জনসেনা পার্টির একজন করে সদস্য রয়েছেন।
এদিকে বর্তমানে এনডিএ জোটের রাজ্যসভায় মোট সদস্যসংখ্যা ১৫৩, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে মাত্র ১১ কম।
লোকসভাতেও তৃণমূলে ‘ভাঙন কৌশল’
লোকসভাতেও তৃণমূলে ভাঙন ধরানোর পৃথক কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে তৃণমূলের ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জন একটি ছোট দল এনসিপিআইয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে এনডিএকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এই একীভূতকরণ কার্যকর করতে লোকসভার স্পিকারের অনুমোদন প্রয়োজন।
এর ফলে লোকসভায় এনডিএর শক্তি বাড়লেও এখনও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমায় পৌঁছাতে পারেনি।
দ্বিমুখী আইনি লড়াই মমতার
দিল্লি থেকে কলকাতা—দুই জায়গাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে চাপে ফেলতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছে।
কলকাতায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জনের বেশি বিধায়ক তৃণমূল ছেড়ে আলাদা গোষ্ঠী গঠন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার ঋতব্রতকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এই গোষ্ঠী নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ দাবি করে নির্বাচন কমিশনের কাছেও দলীয় প্রতীক পাওয়ার আবেদন করেছে। কমিশন শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন দুই ফ্রন্টে আইনি লড়াই করতে হবে। প্রথমত, কলকাতায় তার গোষ্ঠীই প্রকৃত তৃণমূল—এটি প্রমাণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে প্রমাণ করতে হবে যে বিদ্রোহী ২০ জন লোকসভা সদস্য আইনগতভাবে দলত্যাগ করতে পারেন না এবং তাদের সদস্যপদ বাতিল করা উচিত।
এ বিষয়ে লোকসভার স্পিকারের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২০ জন এমপির এনসিপিআইয়ে একীভূত হওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।










































