২২ বছর পর সুইডেন থেকে বহিষ্কারের পথে ব্রিটিশ বিধবা

সংগৃহীত ছবি

ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন দেরিতে করায় ৭৮ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নারীকে দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে ঠিকমতো খেতে ও ঘুমাতে পারছেন না।

অবসরপ্রাপ্ত নার্স জয়েস থমাস ২২ বছর আগে তার স্বামীর সঙ্গে সুইডেনে চলে যান। তিন বছর আগে তার স্বামী ক্যান্সারে মারা যান। এর পর থেকে তিনি সুইডেনেই বসবাস করছেন। তবে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর সুইডেনে থাকার জন্য যে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হতো, তা সময়মতো করেননি থমাস।এ কারণে দেশটির কর্তৃপক্ষ তাকে সুইডেন থেকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছে। এরপর নিজের বৈধভাবে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি একাধিকবার আবেদন ও আপিল করেছেন। কিন্তু তার সব আবেদন ও আপিল প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মঙ্গলবার সুইডেন স্বেচ্ছায় ছাড়ার জন্য তার দেওয়া সর্বশেষ সময়সীমা শেষ হচ্ছে।সুইডেনে নিজের বাড়ি থেকে বিবিসিকে থমাস বলেন, ‘এটা একেবারে অসহ্য পরিস্থিতি। আমি ঘুমাতে পারছি না, খেতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, কী হতে যাচ্ছে।’

২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়। এর ফলে ব্রিটিশ নাগরিকরা আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক হিসেবে গণ্য হননি।ব্রেক্সিটের আগে ব্রিটিশ নাগরিকদের সুইডেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বসবাসের বিশেষ অধিকার ছিল। ব্রেক্সিটের পর সেই অধিকার আর আগের মতো থাকেনি। তবে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে করা বিচ্ছেদ চুক্তিতে একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল। এর আওতায় আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশে বসবাস করা ব্রিটিশ নাগরিকরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারতেন। এই আবেদনের শেষ সময় ছিল ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

থমাস জানিয়েছেন, তিনি ও তার স্বামী জানতেনই না যে তাদের এমন আবেদন করতে হবে। ২০২৩ সালে সুইডেনে ফিরে আসার চেষ্টা করার সময় তিনি প্রথম এই নিয়মের কথা জানতে পারেন। এরপর তিনি নিজের অবস্থান বৈধ করার জন্য একের পর এক আবেদন ও আপিল করেন। কিন্তু কোনো আবেদনই গ্রহণ করা হয়নি। বহু বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর সুইডেনের অভিবাসনবিষয়ক সরকারি সংস্থা মাইগ্রেশনসভেরকেট গত মাসে থমাসকে জানান, তাকে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে হবে। দেশ ছাড়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ৮ সেপ্টেম্বর। থমাসের আইনজীবীরা এখনো তার বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করছেন। তবে এই বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি।

থমাস বলেন, সুইডেন ছাড়তে হলে তাকে তার ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু এবং স্বামীর কবর ছেড়ে যেতে হবে। এই চিন্তা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লান্ত। সত্যিই আমি ক্লান্ত। আর আমি তো আর তরুণ নই। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে বসবাস করছি। আমার বন্ধু আছে, পরিবার আছে। তাহলে সহানুভূতি কোথায়?’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন ২ হাজার ৪৯০ জন ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই সংখ্যা ওই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশ থেকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি ব্রিটিশ নাগরিকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে সুইডেনে বর্তমানে কতজন ব্রিটিশ নাগরিক বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি মাইগ্রেশনসভেরকেট।

সংস্থাটি বলেছে, থমাসের অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে পারে না। তবে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানকে মাইগ্রেশনসভেরকেট জানিয়েছে, ব্রেক্সিটের পর থেকে ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে সুইডেন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। থমাসের ঘটনা একক নয়। গত মাসে আরেকটি পরিবার বিবিসিকে জানিয়েছিল, তাদের বাবাকেও সুইডেন থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি স্মৃতিভ্রংশ এবং রক্তনালিজনিত পারকিনসনিজমে আক্রান্ত। তিনি সুইডেনের একটি পরিচর্যা কেন্দ্রে থেকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও সেবা নিচ্ছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সুইডেনে বসবাস করার পরও তাকে দেশটি ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় ব্রেক্সিটের পর ইউরোপে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল জানিয়েছেন, ব্রেক্সিটের পর যেসব ব্রিটিশ নাগরিক জটিলতায় পড়েছেন, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করার সুযোগ আছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখছে। বিবিসিকে তিনি বলেন, বর্তমান নিয়মগুলো আগের সরকার চালু করেছিল। তাই বিষয়টি সরকার ‘খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখবে’। তিনি বলেন, যারা এই নিয়মের কারণে সমস্যায় পড়েছেন, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করতে কী করা যায়, তা পরীক্ষা করে দেখা হবে। থমাসের ঘটনা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি ফোরসেল। তবে তিনি বলেন, সরকারের অবস্থান হলো, নিয়মগুলো উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য সুইডেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। সুইডেনে বসবাস ও কাজ করা ব্রিটিশ নাগরিকরা যেন দেশটিতে থাকতে পারেন, সেটিই সুইডেন চায়। কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

থমাসের পক্ষে কথা বলেছেন সুইডেনের বিরোধী দল ভ্যানস্টারপারিয়েত বা বাম দলের আইনপ্রণেতা হোকান সভেনেলিং। তিনি সরকারের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান নীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে সুইডেনে বসবাস করা অনেক ব্রিটিশ নাগরিক সমস্যায় পড়ছেন। সভেনেলিং আশা করছেন, সুইডেনের নির্বাচন সরকারের পরিবর্তন আনতে পারে। তার মতে, বিরোধীরা সরকার গঠন করতে পারলে অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এর ফলে জয়েস থমাসের মতো সুইডেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশটিতে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করবে বলে যে বক্তব্য দিয়েছে, যুক্তরাজ্য তা স্বাগত জানায়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সুইডেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত।

LEAVE A REPLY