চট্টগ্রামে গত এক বছর ধরে ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের কাছে আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তাদের কাছে চাঁদা চাইত। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে চাঁদা না দিলে হামলা ও ভাঙচুর করা হতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। ফিল্মি স্টাইলে প্রকাশ্যে এই বাহিনীর গুলি চালানোর একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ডেভিড ইমন অবশেষে ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় একটি কালো রঙের গাড়ি থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় গাড়ির ভেতরে থাকা তার তিন সহযোগী-ঢাকার শ্যামপুর এলাকার আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শামিম (২৮) ও যাত্রাবাড়ী এলাকার সাফায়েত হোসেনকেও (২৮) গ্রেফতার করা হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পরিচয় গোপন করতে চুল ও গোঁফ কেটে ফেলেছিল এই আলোচিত সন্ত্রাসী। নিজেকে ‘মিরাজ’ নামে পরিচয় দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। বুধবার সকাল ১০টার দিকে ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর তাকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা দেয় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এদিকে ডেভিড ইমন যখন যশোরে ধরা পড়েছে, প্রায় একই সময়ে চট্টগ্রামের অন্যতম সন্ত্রাসী রায়হান আলমকে গ্রেফতারে নোয়াখালীতে পৃথক অভিযান চালায় পুলিশ। তবে অল্পের জন্য গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয় রায়হান। পুলিশ জানিয়েছে, রায়হান আলমকে গ্রেফতারেও পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ডেভিড ইমন ও রায়হান চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
যেভাবে গ্রেফতার হলো ডেভিড ইমন : বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফিন্যান্স) মো. নাজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে নজরদারিতে রেখেছিল। একপর্যায়ে তথ্য পাওয়া যায়, ইমন ঢাকায় অবস্থান করছে। তাকে গ্রেফতারে সেখানে অভিযানও পরিচালনা করা হয়। তবে অবস্থান পরিবর্তন করে সে যশোরের দিকে চলে যায়। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল তাকে অনুসরণ করে যশোর পুলিশের সহযোগিতায় ঝিকরগাছা থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার গতিবিধি বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা, সে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পুলিশ ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে সাজ্জাদ বাহিনী, ইমন বাহিনী, রায়হান বাহিনীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে যশোর পুলিশের সূত্র জানায়, যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে একটি কালো রঙের প্রাইভেটকার তল্লাশি করে তাকে আটক করে। আটকের পর বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইমনের আলোচিত গোঁফ কেটে ফেলায় পুলিশের চিনতে বেগ পেতে হয়। একপর্যায়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে সে ডেভিড ইমন।
কে এই ডেভিড ইমন : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ভেডিড ইমন নামে কাউকে চিনত না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য হিসাবে অপরাধজগতে পরিচিতি পায় ইমন। তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। তার বাবার নাম মো. মুসা। সাধারণ কৃষকের ঘরে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। লেখাপড়াও তেমন করেনি। অল্প বয়সে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সাজ্জাদের গ্রুপে যোগ দিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সহজেই নজরে আসে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুনে সরাসরি জড়িত ছিল ডেভিড ইমন। এর আগে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই হত্যাকাণ্ডে ডেভিড ইমন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি করা হয়। সময়মতো চাঁদা না দেওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার দিন নগরীর জিইসির মোড়ে অবস্থিত আরেকটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে চাঁদা দাবি করে ডেভিড ইমন।










































