কোন পে স্কেলে কত শতাংশ বেতন বেড়েছিল, এবার কত?

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কত বাড়তে পারে, এ নিয়েও রয়েছে কৌতূহল।

স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন পর্যন্ত মোট ৮ বার পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। যার সব শেষটি হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট হারে (বর্তমানে পাঁচ শতাংশ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি হলেও, নতুন করে আর আনুষ্ঠানিক বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। নিয়মিত বেতন বাড়লেও মূলত মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য নতুন পে স্কেলের প্রয়োজন হয়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম জাতীয় পে কমিশন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। বর্তমানের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।

কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে পৃথক একটি কমিটি গঠন করে বিষয়টি আবারও পর্যালোচনা শুরু করে। পে কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পর থেকেই বেতন বৃদ্ধির শতাংশের হিসাব নিয়ে নানা আলোচনা সামনে এসেছে।

এক্ষেত্রে অতীতে বাংলাদেশে যে পে স্কেলগুলো ঘোষণা করা হয়েছিল সেখানে কী পরিমাণ বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল, রয়েছে সেই আলোচনাও। 

নবম জাতীয় পে স্কেলের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কবে কত বেতন বেড়েছিল

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। মূলত ওই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলের পে স্কেল ভেঙে একটি নতুন বেতন কাঠামোর প্রবর্তন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

দশটি গ্রেড রেখে ঘোষণা করা ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ছিল দুই হাজার টাকা। যদিও এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এরপর ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। যেখানে ১০টি গ্রেডের পরিবর্তে ২১টি গ্রেড বা ধাপের প্রবর্তন করা হয়।

ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ধরা হয়েছিল ২২৫ টাকা। আর সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে ৭৩ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল পঞ্চাশ শতাংশ।

তৃতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয় ১৯৮৫ সালে। যেখানে এক শ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন, ১২২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে পাঁচ শ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে শতভাগ বাড়িয়ে ছয় হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালে ঘোষিত চতুর্থ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন নয় শ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা তার আগের পে স্কেলের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে দশ হাজার টাকা করা হয়।

বাংলাদেশে পঞ্চম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। ওই পে স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার পাঁচ শ টাকা করা হয়।

সর্বোচ্চ ২৩ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন দুই হাজার ৪০০ টাকা করা হয় ২০০৫ সালে ঘোষিত ষষ্ঠ পে স্কেলে। এ সময় সর্বোচ্চ বেতনভুক্তদের ৫৩ শতাংশ এবং সর্বনিম্নদের ৬০ শতাংশ বেতন বেড়েছিল।

২০০৯ সালে ঘোষণা করা হয় সপ্তম পে স্কেল। যেখানে সর্বনিম্ন গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়িয়ে করা হয় চার হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সব শেষ বেতন কাঠামো অর্থাৎ অষ্টম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বেড়ে আট হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮ হাজার টাকা হয়েছিল।

নবম পে স্কেলের কাজ কতদূর?

অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার প্রায় এক যুগ পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির একটি প্রতিবেদন জমা দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত নবম জাতীয় পে কমিশন। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে বেতন কাঠামোর সুপারিশ প্রণয়নে গত ২১ এপ্রিল একটি কমিটি গঠন করে। যে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে সরকার।

সংসদের বাজেট অধিবেশনে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপর থেকে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ কাজ করলেও এখনো নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।

গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ফোরামে এ নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই বুধবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নবম পে স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।

LEAVE A REPLY