রেলওয়েতে কাটছে না সংকট ধীরগতির ট্রেনে বেহাল যাত্রীসেবা ও সুরক্ষা

শিডিউল মেনে ট্রেন চালানোর নিয়ম কার্যত উঠে গেছে রেলওয়ে থেকে। ১৪০ কিমি.র গতিসম্পন্ন ট্রেন গড়পড়তা ৬৫ কিলোমিটার গতি নিয়ে চলছে। সম্প্রতি সারা দেশে বিভিন্ন জোনের চলন্ত ট্রেন পর্যবেক্ষণ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রায় ১৮শ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথ সংস্কারসহ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-কোচ মেরামতের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু রেলপথ বা ইঞ্জিন-কোচ সংস্কার হলেই ট্রেনে অন্তত একশ কিলোমিটার গতি ফেরানো সম্ভব। লেভেল ক্রসিং সংস্কার ও অবৈধ ক্রসিং বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেনের গতি ফিরিয়ে আনতে পারলে একই সময়ে দ্বিগুণ সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে।

রেলওয়ের তথ্য বলছে, ঢাকা-কক্সবাজারের দূরত্ব ৪৮০ কিলোমিটার। এ পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে ট্রেনের সময় লাগার কথা ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। এছাড়া ঢাকা-পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৬৩৯ কিলোমিটার। এ রুটে ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেন পৌঁছাতেই সময় লাগছে প্রায় ৯ ঘণ্টা; পঞ্চগড়ে যেতে ১২ ঘণ্টাও লেগে যায়। গড়পড়তা (আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার) ৫০ শতাংশ সময়ানুবর্তিতাও ধরে রাখা যাচ্ছে না। রেলের কিছু কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ট্রেনের গতি বাড়ানোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে গড়িমসি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘ট্রেনের গতি বাড়ানোসহ যাত্রীদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। ১৪০ কিলোমিটার গতি সম্পন্ন ইঞ্জিন ও কোচ সমপরিমাণ গতিতে চালানো যাচ্ছে না স্বীকার করে তিনি বলেন, জরাজীর্ণ লাইন থাকায় গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ গতির ট্রেন হলে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ত। আয়ের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও সুরক্ষাও বাড়ত। নতুন করে উচ্চগতির ইঞ্জিন ও কোচ কেনা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ট্রেনের বিলম্ব যেন নিয়ম : রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রেলে বর্তমানে ২৮৫টি যাত্রীবাহী ট্রেন রয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি আন্তঃনগর ট্রেন। বিরতিহীন ট্রেনের সংখ্যা মাত্র তিনটি। ট্রেনের চালানোর কাজে সম্পৃক্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যাত্রী পরিষেবার মূল বিষয় হলো সঠিক সময়ে ট্রেন পৌঁছানো। এছাড়া রয়েছে যাত্রীসেবা ও সুরক্ষার অন্যান্য কার্যক্রম। কিন্তু গত দুই যুগ ধরেই রেলের এই মূল তিনটি বিষয়ই উধাও হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টার ট্রেন দেরি করা নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অভিযোগ আছে, বিলম্বে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস মালিকদের সঙ্গে রেলওয়ে বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তাছাড়া মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় চলছে চরম নৈরাজ্য। গত অর্থবছরেও রেল লোকসান গুনেছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

৮৫ শতাংশ রুট জরাজীর্ণ, ট্রেন গতিহীন : রেলওয়ে অবকাঠামো দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, রেলওয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ রুট জরাজীর্ণ। চলমান সংস্কার কার্যকর করতে প্রতি অর্থবছরেই বরাদ্দ থাকে। কিন্তু বরাদ্দের বেশির ভাগই লুটপাট হয়। মাইলের পর মাইল রেলপথে যথাযথ পাথর নেই। পুরো রেলপথের অধিকাংশ স্থানে স্লিপার, ডগস্পাইক (হুক), ফিশপ্লেট খোলা রয়েছে। বর্তমানে রেলওয়ে সেতুর মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। আখাউড়া থেকে সিলেট রেলপথ খুবই জরাজীর্ণ।

এ পথে কখনো কখনো ৫ থেকে ১০ শতাংশ গতি নিয়ে ট্রেন চালাতে হয়। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রেলপথ জরাজীর্ণ প্রায় তিন যুগ ধরে। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো যেন মরণফাঁদ। রেলওয়ে রোলিংস্টক দপ্তর বলছে, বর্তমানে ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে। এসব ইঞ্জিনের ৭৭ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিগত আওয়ামী সরকার প্রায় ১৬ বছরে রেলে সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ উন্নয়নের পেছনে ছিল লুটপাট।

কী বলছেন কর্মকর্তারা : পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, কোনো ট্রেনই যথাযথ গতি নিয়ে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ১২০ কিংবা ১৪০ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চালানো এখনো স্বপ্নেই রয়েছে। এর মূল কারণ জরাজীর্ণ ইঞ্জিন, রুট এবং জনবল সংকট। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ইঞ্জিনের সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। এই অবস্থায় বেশি গতির ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়তে পারে।

রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যাত্রীবাহী ট্রেনের গতি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। গতি বাড়ানোর সঙ্গে আয় বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। গতি বাড়লে ঢাকা-যশোর ও ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে বেশি সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ পাওয়া যাচ্ছে না দাবি করেন তিনি।

LEAVE A REPLY