সংগৃহীত ছবি
সাপ্তাহিক ছুটির পর আবার ব্যস্ত রুটিনে ফিরতে হয়। বদলে যায় ঘুমের সময়, বাড়ে কাজের চাপ, শুরু হয় ছুটে চলা।এই পরিবর্তন শুধু মন-মেজাজেই নয়, শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহের শুরুর দিকে গুরুতর ধরনের হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সপ্তাহের কোনো একটি দিনই হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী। বরং ঘুমের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, শরীরের স্বাভাবিক দৈনিক ছন্দ এবং জীবনযাপনের নানা পরিবর্তন একসঙ্গে হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডে করা একটি গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১০ হাজারের বেশি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মধ্যে ছিল সবচেয়ে গুরুতর ধরনের হার্ট অ্যাটাক, যাকে ST-segment elevation myocardial infarction বা STEMI বলা হয়।
গবেষণায় সপ্তাহের শুরুর দিকে এসব হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। রবিবার রাতে যেসব দেশে সোমবার কর্মদিবস, সেখানকার অনেক মানুষের মধ্যেই পরদিন অফিসে ফেরার চিন্তা দেখা দিতে পারে। গবেষণায় জানা যায়, সোমবারে এর হার অন্য দিনের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। বাংলাদেশে একই ধরনের বিষয় প্রযোজ্য হতে পারে শুক্রবার-শনিবারের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসের ক্ষেত্রে।
কেন সপ্তাহের শুরুতে এমন হতে পারে?
এর একটি সম্ভাব্য কারণ শরীরের নিজস্ব দৈনিক ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম। ঘুম থেকে ওঠার সময় শরীরে কিছু হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। একই সময়ে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনেও পরিবর্তন আসে।
সকালের এই স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে যদি মানসিক চাপ যুক্ত হয়, তাহলে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। সপ্তাহের শুরুতে কাজে ফেরার চিন্তা, সময়মতো বের হওয়ার তাড়া, যানজট কিংবা জমে থাকা কাজের চাপ—সবই মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
গবেষকদের মতে, হৃদ্যন্ত্রের গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে শরীরের দৈনিক ছন্দ ও মানসিক চাপ—দুই ধরনের কারণই ভূমিকা রাখতে পারে।
ছুটির দিনের রুটিনও কি প্রভাব ফেলে?
সাপ্তাহিক ছুটিতে অনেকের ঘুম ও খাবারের রুটিন বদলে যায়। রাতে দেরি করে ঘুমানো, সকালে দেরিতে ওঠা, বেশি খাওয়া কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি শারীরিক কর্মকাণ্ড—এসব অভ্যাস পরের কর্মদিবসে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে কয়েক দিন অনিয়মের পর হঠাৎ স্বাভাবিক ব্যস্ত রুটিনে ফিরে গেলে শরীরকে দ্রুত মানিয়ে নিতে হয়। এর সঙ্গে যদি পর্যাপ্ত ঘুম না হয় বা মানসিক চাপ বেশি থাকে, তাহলে শারীরিক চাপও বাড়তে পারে।
তবে এসব কারণকে হার্ট অ্যাটাকের সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যাদের আগে থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এসব বিষয়কে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন এবং পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
অনেক সময় হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ধীরে ধীরে ব্লক তৈরি হলেও শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। পরে কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে গুরুতর করে তুলতে পারে।
তাই শুধু সপ্তাহের শুরুর দিন নয়, নিয়মিতভাবেই হৃদ্স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা জরুরি।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী?
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি
- ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া
- শ্বাসকষ্ট
- অস্বাভাবিক ঘাম
- বমি বমি ভাব
- মাথা ঘোরা
- হঠাৎ দুর্বল বা অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা
সব মানুষের ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। তাই অস্বাভাবিক বা গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কিভাবে হৃদযন্ত্রের যত্ন নেবেন?
সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ঘুমের সময় যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখা ভালো। অতিরিক্ত রাত জাগা এবং রুটিনে বড় ধরনের পরিবর্তন এড়িয়ে চলা উপকারী।
পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
আসল বিষয় দিন নয়, রুটিন
সপ্তাহের শুরুর দিনে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি দেখা যাওয়ার কিছু গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ থাকলেও এর অর্থ কোনো নির্দিষ্ট দিনই হৃদরোগের জন্য বিপজ্জনক—এমন নয়। বরং ছুটির পর ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন, মানসিক চাপ এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ—সবকিছু মিলেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন গবেষকরা।
তাই সপ্তাহের কোনো একটি দিনকে ভয় পাওয়ার বদলে নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।











































