পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থেকে ফেরত সাড়ে ৮১ হাজার বিদেশগামী

বিদেশ যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করে বিমানবন্দরে পৌঁছেও গন্তব্যে যেতে পারছেন না হাজার হাজার বাংলাদেশি। ভিসা ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্রে অসংগতি, জাল কাগজপত্র, ভিসার শর্ত ভঙ্গ, ইমিগ্রেশনে তথ্যের গরমিল এবং মানবপাচারের আশঙ্কাসহ নানা কারণে তাদের বিদেশযাত্রা আটকে যাচ্ছে।কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ বা সীমিত শ্রমবাজারে বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টাও ধরা পড়ছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিমানবন্দর থেকে ৮১ হাজার ৫০০ যাত্রীর বিদেশযাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন ভিসায় বিদেশ গেছেন দুই কোটি ৯১ লাখের বেশি বাংলাদেশি।

এসবির বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে বণিক বার্তা জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ বাংলাদেশি বিদেশ গেছেন।এ সময়ে বিভিন্ন কারণে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৭ হাজার ৮১৯ জনকে। ২০২৫ সালে বিদেশ গেছেন ৫৭ লাখ ৮ হাজার ১৩২ জন। ওই বছর আটকে দেওয়া হয় ১৫ হাজার ৫১৬ জনের যাত্রা। ২০২৪ সালে ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৩ জন বিদেশ গেলেও বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৯ জনকে।২০২৩ সালে ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩ জন বিদেশ যাওয়ার বিপরীতে ফেরত পাঠানো হয় ৯ হাজার ৮৭২ জনকে। ২০২২ সালে ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৩ জন বিদেশ যান এবং ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৭৫৬ জনকে। ২০২১ সালে বিদেশ যান ২০ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৩ জন, ফেরত পাঠানো হয় ১১ হাজার ৫২৮ জনকে।

সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমানে যাওয়ার সময় তাসলিমা বেগম (ছদ্মনাম) নামের এক নারীকে আটকে দেওয়া হয়। স্বামীর কাছে যাওয়ার কথা বলে তার কাছে বিএমইটি ছাড়পত্রও ছিল।তবে ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞাসাবাদে তার বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে।

তাসলিমা জানান, ওমানে থাকা স্বামীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে ‘মোবাইলে’। বিয়ের কোনো বৈধ নথি না থাকায় সন্দেহ হয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের। পরে তার দেখানো বিয়ের ছবিও পরীক্ষা করে জাল বলে সন্দেহ করা হয়। ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই করে দেখা যায়, একই স্পাউস ভিসা অনুমোদনপত্র ব্যবহার করে ভিন্ন সময়ে আলাদা পাসপোর্টে পাঁচ নারীকে ওমানে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। এরপর তার বিদেশযাত্রা বাতিল করা হয়।

ইমিগ্রেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বন্ধ বা সীমিত শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নথির পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। সরকারি সিল, স্বাক্ষর ও অনুমোদনপত্র নকল করে কাগজপত্র তৈরির ঘটনাও ধরা পড়ছে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসনের ঘটনায় অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, তুরস্ক, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, লিবিয়া, মেক্সিকো ও ব্রাজিল।

ইতালির পারিবারিক ভিসা ঘিরেও সংঘবদ্ধ জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ‘পেজ সাবস্টিটিউশন’ পদ্ধতিতে প্রকৃত ভিসাগ্রহীতার পাসপোর্ট থেকে ভিসার পৃষ্ঠা, বাংলাদেশের বহির্গমন সিল ও ইতালির প্রবেশ সিল নকল করে অন্য ব্যক্তির পাসপোর্টে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ফ্রান্সে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি প্রায় ১০ হাজার ইউরো খরচ করে তৈরি করা ভুয়া সুইস পাসপোর্ট নিয়ে দেশে ফিরলে সেটিও বিমানবন্দরে ধরা পড়ে। পাসপোর্টের আকারে অসংগতি এবং পরে স্ক্যানিংয়ে বায়োমেট্রিক চিপের সংকেত না পাওয়ায় জালিয়াতি শনাক্ত হয়।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের কিছু তরুণ ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ পথে জনপ্রতি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে এসব রুটে যাত্রীদের বিষয়ে আলাদাভাবে নজর রাখা হচ্ছে।

তবে সব ক্ষেত্রে জালিয়াতি বা অবৈধ অভিবাসনের ঘটনা নয়। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ইমিগ্রেশনে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। তালহা রহমান (ছদ্মনাম) নামের এক শিক্ষার্থী জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রথমবার থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় তাকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় জানার পর তাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়।

আরেক যাত্রী আশিকুর রহমান (ছদ্মনাম) জানান, বৈধ ভিসা ও বিএমইটি ছাড়পত্র থাকার পরও তাকে মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে উঠতে দেওয়া হয়নি। পরে ইমিগ্রেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তিনি যেতে পারেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার ঠেকাতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের আচরণ ও তথ্য যাচাই করে সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে টাকা দিয়ে পার পাওয়া বা অন্যায্যভাবে আটকে দেওয়ার কিছু অভিযোগ সত্য বলেও স্বীকার করেন তিনি।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, শুধু দালাল বা জালিয়াতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বিদেশগামী কর্মীর নথিপত্র যাচাই ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। বিএমইটি ও বিদেশে বাংলাদেশের মিশনের লেবার উইংয়ের যাচাইপ্রক্রিয়ায় আরো নজরদারি প্রয়োজন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বিএমইটির ভিসা যাচাইয়ের সক্ষমতা সীমিত। কিছু অসাধু কর্মকর্তা নকল নথিপত্রে ছাড়পত্র দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্যও তার নজরে এসেছে। সার্বিয়ায় ভুয়া ভিসায় বিএমইটি ছাড়পত্র দেওয়ার একটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সার্বিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লিবিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা যাচাই আরো কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএমইটিতে পূর্ণাঙ্গ ভিসা যাচাই ব্যবস্থা চালু এবং ইমিগ্রেশনের একটি দল সেখানে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

LEAVE A REPLY