সুন্দর জীবন গড়ার আশায় প্রতিবছর হাজারো নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গেলেও বিদেশ যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় অনেকে গন্তব্য দেশে গিয়ে বিপদে পড়ছেন।শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।
সংসদে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ১০০ নারী কর্মীর মরদেহ ফিরেছে দেশে।একই সময়ে বিদেশে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ সংসদে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার দাবি জানান।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশ থেকেও কর্মীরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং দূতাবাসগুলো সহায়তা করে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ হাজার ২১৪ জন বা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন।এ সময়ে ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী গেছেন। তাদের ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরব ও জর্দানে। নতুন শ্রমবাজার হিসেবে জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশেও নারী শ্রমিক যাচ্ছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় অংশের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। তাদের মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) এক গবেষণায় দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ৯৭ শতাংশ এবং ৯৭ শতাংশ সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনেক নারী বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন ও কর্মপরিবেশ পান না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের ভাষা, কাজের দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের গৃহকর্মের বাইরে নার্সিং ও পরিচর্যার মতো কাজেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।











































