সংগৃহীত ছবি
আমস্টারডাম শহরের কেন্দ্রে একটি শীতল, বৃষ্টিভেজা বিকেলে হ্যারলেমারডাইক নামের একটি রাস্তায় ১৭ শ শতাব্দীর একটি সরু ভবনে ক্রেতারা একে একে প্রবেশ করছেন। ভবনের সামনের দরজার ওপর একটি ঝকঝকে সূর্য আকারের সোনালি সাইনবোর্ড ঝুলছে। এটি একটি চা-কফির দোকান এবং এই দোকানের নাম ‘ত্ জোনেত্যে’, যা ডাচ ভাষায় ‘ছোট্ট সূর্য’।
প্রতিবার কারো প্রবেশে সেখানে ঘণ্টা বাজে।
বর্তমানে সেখানে পর্যটক ও নিয়মিত ক্রেতাদের একটি মিশ্র দল আসেন — যারা প্রতি সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ অন্তর কফি ও চা কিনতে আসেন, যেমনটি তাদের পূর্বসূরিরা প্রায় ৪০০ বছর ধরে করে আসছেন।
কিন্তু আমস্টারডামের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের কাছে প্রিয় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান খুব শিগগিরই হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের মালিক মেরি-লুইস ফেলডার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি মে মাসের শেষদিকে দোকানটি বন্ধ করে দিতে চান, কারণ বছরের পর বছর ধরে ভাড়ার মারাত্মক বৃদ্ধির কারণে আর টিকতে পারছেন না। এটি আমস্টারডামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
এই ভাড়া বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের পেছনে অন্যতম কারণ পর্যটন।
৭৬ বছর বয়সী ফেলডার আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে উঠেছেন এবং ১৯৯৯ সাল থেকে দোকানটির মালিক। তিনি সিএনএনকে বলেন, ডাচ সংবাদপত্র হেট পারুল এপ্রিলের মাঝামাঝি দোকান বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকে তিনি গ্রাহক ও বন্ধুদের কাছ থেকে প্রচুর সমর্থন পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, তিনি তার গল্প আরও বড় পরিসরে শেয়ার করতে পেরে খুশি — এই আশায় যে, এটি হয়তো ‘ত্ জোনেত্যে’কে বন্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
দীর্ঘদিনের গ্রাহকরা এই খবরে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কেট কার্লাইল, যিনি আমস্টারডামে আট বছর ধরে বাস করছেন ও দীর্ঘদিনের ক্রেতা, প্রথম ‘ত্ জোনেত্যে’ আবিষ্কার করেন ডাচ রাজধানীতে সফরের সময়। তার সঙ্গে ছিল তার কুকুর, আর তিনি দারুণভাবে আপ্লুত হন ফেলডারের ‘উষ্ণ অভ্যর্থনা’ পেয়ে।
এখন কার্লাইল প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর দোকানে যান কফি কিনতে। এখন ফেলডারের সঙ্গে কফি ও প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।তিনি বলেন, ‘ত্ জোনেত্যে’ বন্ধ হয়ে গেলে এটি শহরের জন্য একটি বড় ক্ষতি হবে।
তিনি সিএনএন ট্রাভেলকে বলেন, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। এই ভবন, এর ইতিহাস এবং রাস্তার বৈশিষ্ট্য। তাই আমি সত্যিই আশা করছি, কিছু একটা করা প্রয়োজন একে রক্ষা করার জন্য। না হলে এখানে শুধু স্ট্রিপ মলের মতো জায়গা তৈরি হবে। কিন্তু আমস্টারডাম এমন নয়। মানুষ এখানে আসে এই কারণেই নয়।
আমস্টারডাম, যেটি এই অক্টোবর মাসে তার ৭৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের জন্য এক বছরের দীর্ঘ উৎসবে মেতে আছে, বহু বছর ধরে চেষ্টা করছে কিভাবে তার অনন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। কারণ অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ শহরের বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তনের হুমকিতে ফেলেছে।
গত দশকে শহরের কর্মকর্তারা পর্যটন নীতি এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে অতি পর্যটনের ঢল ঠেকানো যায় এবং এমন ধরনের পর্যটক আকৃষ্ট হয় যারা আমস্টারডামের জাদুঘর ও সংস্কৃতিকে উপভোগ করতে চান, বিখ্যাত ‘বিকার’ গুলোর অংশ হতে নয়।
এই লক্ষ্যে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে— পর্যটন কর বাড়ানো, ঐতিহাসিক দে ভ্যালেন এলাকায় ট্যুর নিষিদ্ধ করা, ক্রুজ জাহাজ নিষিদ্ধ করা এবং কেবলমাত্র পর্যটকদের জন্য খোলা দোকানগুলো সীমিত করা।
এদিকে, শত শত বছরের পুরনো ব্যবসা যেমন ‘ত্ জোনেত্যে’, যেগুলো স্থানীয় পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত ছিল, তারা এখন ক্রমবর্ধমান ভাড়ার চাপে আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, কারণ টিকটকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নতুন রেস্তোরাঁ, জেনেরিক মিষ্টির দোকান এবং গাঁজা বিক্রয়কারী কফিশপগুলো পর্যটকদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের মার্চে মার্কিন সাবেক বক্সার মাইক টাইসন আমস্টারডামে তার প্রথম গাঁজা বিক্রির দোকান খুলেছেন, যেটি শহরের অভিজাত এলাকা সোহো হাউস ও ডাব্লিউ আমস্টারডামের কাছেই।
কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, শহরের কর্মকর্তারা লোকাল মালিকানাধীন পুরনো ব্যবসা যেমন ‘ত্ জোনেত্যে’কে রক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেননি।
ফ্রেইজ ইউনিভার্সিটেইট আমস্টারডামের নগর নৃতত্ত্ববিদ এবং অধ্যাপক দিমিট্রিস ডালাকোগলো সিএনএনকে বলেন, আমস্টারডাম ও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের নেতারা ‘এই নগর বিপর্যয় রোধ’ করার দায়িত্ব অনেক আগেই পরিত্যাগ করেছেন।
তিনি ২০১৮ সালে এক নিবন্ধে সতর্ক করে দেন যে আমস্টারডাম ‘নিজেরই একটি ফাঁপা মুখোশে পরিণত হচ্ছে’ এবং ‘ত্ জোনেত্যে’র বন্ধ হয়ে যাওয়া শহরের আরেকটি ‘ছোট মৃত্যু’।
আমস্টারডামে ভাড়াবৃদ্ধি একটি বড় সমস্যা। ২০১৯ সালে এই দোকানের বার্ষিক ভাড়া ছিল প্রায় ১৮,০০০ ইউরো। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মালিক পক্ষ বার্ষিক ভাড়া ৭২,০০০ ইউরো করার প্রস্তাব দেয়।
ফেলডার এই ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আদালতে যান। আদালত বার্ষিক ভাড়া কমিয়ে প্রায় ৫০,০০০ ইউরো নির্ধারণ করলেও, ফেলডার বলেন দোকান চালানোর খরচ, চারজন কর্মচারীর বেতনসহ — এই আয় দিয়ে সামলানো সম্ভব নয়। দোকান থেকে দিনে মাত্র ৩০০ ইউরোর মতো আয় হয়।
এই সব কিছুর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব পড়েছে ফেলডারের ওপর। এসব কষ্টের মাঝেও ফেলডার ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি সহজে হাসেন, কর্মীদের সঙ্গে খোশগল্প করেন এবং দোকানে আসা সবাইকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। তবু ব্যবসা বন্ধ হওয়ার চিন্তায় তার মন ভারাক্রান্ত। তিনি বলেন, আমি আমার গ্রাহকদের ভালোবাসি। তারা দারুণ এবং তারাও আমাকে ভালোবাসে।
বৃষ্টি ও গরম নিয়ে নতুন বার্তা আবহাওয়া অফিসের
তিনি বলেন, এই দোকান আমার বাচ্চা। তবে সেই ‘বাচ্চা’ এখন কঠিন সময় পার করছে — এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। শহরের সরকার এই দোকানকে রক্ষার জন্য বিশেষ কোনো আইনি সুরক্ষা দেবে কি না, সেটাও পরিষ্কার নয়।
সূত্র : সিএনএন।







































