বাস্তবতা কঠিন তবু হাল ছাড়তে চাই না

প্রশ্ন : প্রথমবারের মতো মেয়েরা এশিয়ান কাপে খেলতে যাচ্ছে। প্রস্তুতি যেভাবে হয়েছে, তা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

পিটার বাটলার : সত্যি বলতে, প্রস্তুতি হতাশাজনক হয়েছে। আমি সন্তুষ্ট নই। যদিও আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না।

 তবে আমরা ম্যাচ ও অনুশীলন ক্যাম্পের অভাবে ভুগেছি, যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। গত বছরের অক্টোবরে একটি ছয় মাসের খসড়া পরিকল্পনা বানিয়ে বাফুফেকে দিয়েছিলাম। যেখানে সব পরিকল্পনা ছিল। কিভাবে শুরু করা যায়, মাঝের এই সময়টাতে কী করা উচিত এবং কোথায় গিয়ে থামতে হবে।পরিকল্পনায় উল্লেখ করেছিলাম যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশের বাইরে কোথাও ছয় সপ্তাহের ক্যাম্প করতে চাই, যেমনটা ভারত ও অন্য দেশ করেছে। কিন্তু আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি। চট্টগ্রামে দুই দফায় ক্যাম্প করেছি, কিন্তু আমরা খেলার গতি ও তীব্রতার দিক থেকে এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নই। সামনে খুব কঠিন ও চাপের পরিবেশে খেলতে হবে।

 বলতেই হয়, সেই চ্যালেঞ্জের জন্য আমরা যথেষ্ট প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারিনি।

প্রশ্ন : প্রস্তুতি আদর্শ না হলে তো ভালো করা নিয়েও সংশয় থাকে।

পিটার বাটলার : গত ডিসেম্বরের ২ তারিখের পর থেকে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলিনি। আড়াই মাস পার হয়ে গেছে। এখানেই আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি।

 ভারত কিন্তু কয়েকটি দেশে গিয়ে ক্যাম্প করেছে, ম্যাচ খেলেছে। মেয়েদের লিগের সূচি পরিবর্তন করা ঠিক হয়নি। এতে সপ্তাহে তিনটি করে ম্যাচ খেলতে হয়েছে। সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টের জন্য পরিকল্পনাও আদর্শ ছিল না। তবে পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি যে এ রকম পরিস্থিতি থেকেও ভালো শিক্ষা পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে আমাদের পরিকল্পনা আরো ভালোভাবে করতে হবে এবং যত বেশি সম্ভব মেয়েদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। আমরা এখনো অন্য দেশগুলোর মতো পুরোপুরি পেশাদার নই। তাই মেয়েদের আরো ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ও শৃঙ্খলাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : লিগে মেয়েরা কমলাপুরের টার্ফে খেলেছে। এশিয়ান কাপে খেলবে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির ঘাসের মাঠে। অল্প দিনের মধ্যে মানিয়ে নেওয়াটা কতটা চ্যালেঞ্জের?

পিটার বাটলার : কমলাপুরের টার্ফ, জাতীয় স্টেডিয়ামের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ঘাসের মাঠগুলোর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমি মনে করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মানিয়ে নেওয়া কঠিন এবং সেই সময়টাও আমরা পাচ্ছি না। সিনিয়র দলের পর অনূর্ধ্ব-২০ দলেরও এশিয়ান কাপ আছে। তাই অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের খেলোয়াড়দেরও স্কোয়াডে নেওয়া হয়েছে। তারা যেন মানিয়ে নিতে পারে সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন : কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে খেলার কারণে খেলোয়াড়দের মধ্যে কি কোনো ‘মিথ্যা’ আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? যারা ভাবছে চীন, কোরিয়ার মতো দলকে হারানো সম্ভব, তারা ফুটবল বোঝে না। উজবেকিস্তান আলাদা ব্যাপার। তারাও কঠিন দল। তবু আমরা এমন খেলা খেলতে চাই, যাতে মানুষের হৃদয় ও মন জয় করতে পারি।

পিটার বাটলার : হ্যাঁ, সেটা তো কিছুটা হয়েছেই। মেয়েদের যে লিগ হয়েছে সেটা ধীরগতির। এখানে অনেক সময় ভুল করলেও শাস্তি পেতে হয় না। কিন্তু এশিয়ান পর্যায়ে প্রতিটি ভুলের শাস্তি হয়, এটি কঠোর এবং বড় দলগুলো কোনো দয়া দেখায় না।

প্রশ্ন : লিগ না খেলে বরং ট্রেনিং ক্যাম্প চালিয়ে যাওয়াই উচিত ছিল বলে মনে করেন?

পিটার বাটলার : অক্টোবর ও ডিসেম্বরের ম্যাচগুলো থেকে যে মোমেন্টাম পেয়েছিলাম, তা ২০২৬ সালে এসে হারিয়ে গেছে। লিগের ম্যাচ খেললেও সেটা খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না, কারণ লিগে খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। ক্লাবের অনুশীলনের মানও সেরা পর্যায়ে ছিল না। জাতীয় দলের অনুশীলন ম্যাচও লিগ ম্যাচের চেয়ে বেশি উপকারী। জিপিএস ডেটা তা স্পষ্ট প্রমাণ করেছে। লিগ অবশ্যই থাকা উচিত, তবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সঙ্গে সংগতি রেখে আরো ভালোভাবে পরিকল্পনা করা দরকার। লিগের কাঠামো উন্নত করা দরকার।

প্রশ্ন : চূড়ান্ত দলে অভিজ্ঞদের সঙ্গে কিছু তরুণও রেখেছেন।

পিটার বাটলার : কিছু অভিজ্ঞ খেলোয়াড় থাকলেও এএফসি পর্যায়ে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত। তরুণ খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের মধ্যে ভালো করার সেই দৃঢ়তা ও মানসিকতা আমি দেখেছি। তাদের প্রতি আমার আস্থা আছে। এই যেমন আলপি ও সুরভী আকন্দ এই দলে থাকার দাবি রাখে। এটা ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিছুদিন পর তারা অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ খেলবে। তাদের প্রস্তুতিটাও হয়ে যাবে।

প্রশ্ন : চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে হচ্ছে। কী প্রত্যাশা করছেন?

পিটার বাটলার : কোনোটিই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। প্রথম দুই ম্যাচে আমাদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। চীন ও কোরিয়া ম্যাচে কিছু প্রত্যাশা করা কঠিন। উজবেকিস্তানও ভালো দল। টেকনিক্যালি ভালো কিছু খেলোয়াড় আছে তাদের। তবে আমরা গত নভেম্বরে আজারবাইজানের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছিলাম, সে রকম হলে উজবেকিস্তান ম্যাচে চমক দেখাতে পারি।

প্রশ্ন : কোয়ার্টার ফাইনালে গেলে অলিম্পিক ও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ থাকবে। সেটা নিয়ে কী ভাবছেন?

পিটার বাটলার : বিশ্বকাপের কথা এখন ভাবার সুযোগ নেই, বিশেষ করে নারী লিগ খেলার পর সেটা বাস্তবসম্মত নয়। আমি শুধু সততার সঙ্গে বাস্তবতার কথাই বলছি, আপনি যেভাবেই এটাকে ব্যাখ্যা করতে চান। সত্যি বলতে চীন ও কোরিয়ার বিপক্ষে আমরা সমান তালে লড়াই করতে পারব না। যারা ভাবছে চীন, কোরিয়ার মতো দলকে হারানো সম্ভব, তারা ফুটবল বোঝে না। উজবেকিস্তান আলাদা ব্যাপার। তারাও কঠিন দল। তবু আমরা এমন খেলা খেলতে চাই, যাতে মানুষের হৃদয় ও মন জয় করতে পারি। গর্ব নিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে চাই এবং মাঠে লড়াই করতে চাই। হাল ছাড়তে চাই না এবং বিশ্ব মঞ্চে দেখাতে চাই বাংলাদেশেও প্রতিভা আছে।

LEAVE A REPLY