ছবি: রয়টার্স
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ এখন তৃতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। এই দীর্ঘ সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিই বদলাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন আলোচনা তৈরি করছে। বিশেষ করে চীনের জন্য এই যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, কৌশল এবং যুদ্ধ পরিচালনার ধরন কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাচ্ছে।
একই সঙ্গে এটি চীনকে এটাও বুঝতে সাহায্য করছে যে, আধুনিক যুদ্ধে ফলাফল এককভাবে কোনো একটি পক্ষ নির্ধারণ করতে পারে না। প্রতিপক্ষের সক্ষমতা এবং কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত দুই মাসে পারস্য উপসাগর এবং এর আশপাশের এলাকায় যে সংঘর্ষ চলছে, তা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বড় যুদ্ধ পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ থেকে বোঝা যাচ্ছে, যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাত তৈরি হয়, তাহলে পরিস্থিতি কী ধরনের হতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে সম্ভাব্য উত্তেজনার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুরু থেকেই তারা ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।এই হামলায় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়। একই সময়ে স্কুলে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৭০ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এতে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং বহু এলাকায় ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়।
হামলার পরপরই ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়।
এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন ইরান বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়।
টানা ৩৯ দিন চলা এই সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।
এরপর অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এর মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এরপর থেকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
এই লড়াই শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে চীন এই যুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার এবং কৌশলগত শক্তি সম্পর্কে চীনের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যু, কিভাবে রূপ নিতে পারে—সে বিষয়েও নতুন ধারণা দিচ্ছে এই যুদ্ধ।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে চীনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সংঘাত চীনকে যেমন আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝাচ্ছে, তেমনি নিজেদের প্রতিরক্ষা দুর্বলতাও সামনে আনছে।
চীনের সাবেক বিমানবাহিনী কর্নেল ফু চিয়ানশাও বলেন, আধুনিক যুদ্ধে শুধু আক্রমণ শক্তিশালী করলেই হবে না, একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সমানভাবে উন্নত হতে হবে। তার মতে, ইরান তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা আগেই চিহ্নিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে চীন তার সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা অর্জনে দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
রুসি থিংকট্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, চীন দ্রুতগতিতে জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনীয়। পাশাপাশি দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ বোমারু বিমান তৈরির কাজও চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি বাস্তব যুদ্ধে পরীক্ষিত নয়।
তাইওয়ান ইস্যু এখন সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে পুনরায় একীভূত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তাইওয়ানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতে ড্রোন ও দূরপাল্লার রকেট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা যেকোনো সংঘাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের কিছু কারখানা প্রয়োজন হলে স্বল্প সময়ে ব্যাপকভাবে ড্রোন উৎপাদনে সক্ষম।
অন্যদিকে, তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার যুদ্ধের ধরনই বদলে দিচ্ছে। কম খরচে বিপুল সংখ্যক ড্রোন দিয়ে বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি করা সম্ভব হচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তাইওয়ান ইস্যুতে সংঘাত হলে ড্রোন যুদ্ধই মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ অভিজ্ঞতা তাদের বড় সুবিধা দিচ্ছে। ইরাক ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন সংঘাতে অংশ নিয়ে তারা বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে আধুনিক যুদ্ধ কত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
সবশেষে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে অস্থিরতা ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সংঘাত শুরু হলে তা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।










































