যুক্তরাষ্ট্রে ৬ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ঘটনা, আইস এজেন্টের গুলিতে অভিবাসী নিহত

ছবি : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিযানের সময় এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনার এক সপ্তাহও পার হয়নি। এর মধ্যেই সোমবার মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি উপকূলীয় শহরে আইস কর্মকর্তাদের গুলিতে আরো এক চালক নিহত হয়েছেন।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, গাড়ি থামানোর চেষ্টা করলে ওই ব্যক্তি এজেন্টদের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় জননিরাপত্তার স্বার্থে আইসের এক কর্মকর্তা তার ওপর গুলি চালান।

তবে ডিএইচএসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি, চালক কিভাবে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছিলেন। সোমবার সকাল প্রায় ৭টার (ইডিটি) দিকে মেইনের বিডেফোর্ড শহরে এ ঘটনা ঘটে।শহরটি মেইনের বৃহত্তম নগরী পোর্টল্যান্ড থেকে প্রায় ১৫ মাইল (২৪ কিলোমিটার) দক্ষিণে অবস্থিত।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) ঘটনাটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেনি। সংস্থাটি জানায়, আইস কর্মকর্তারা এমন এক ব্যক্তির সর্বশেষ পরিচিত ঠিকানায় নজরদারি চালাচ্ছিলেন, যার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত আদেশ ছিল।

ডিএইচএসের দাবি, নজরদারির সময় একজন অভিবাসী ওই বাসা থেকে একটি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যান এবং তাকে অনুসরণ করার সময় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেনি, গাড়িতে থাকা ব্যক্তিই কি সেই ব্যক্তি ছিলেন, যার ঠিকানা নজরদারির আওতায় ছিল। ডিএইচএস আরো জানিয়েছে, ঘটনার পর বিডেফোর্ড পুলিশ বিভাগ ও এফবিআই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্তে অংশ নেয়।

অন্যদিকে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা বলেছেন, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি ২৬ বছর বয়সী এক কলম্বিয়ান নাগরিক। তাদের দাবি, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন এবং তার একটি সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরও ছিল। তবে কর্মীরা তার নাম প্রকাশ করেননি।এ ছাড়া কিভাবে তারা ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানাননি।

 মেইনে সোমবারের গুলির ঘটনা এবং গত সপ্তাহে টেক্সাসে ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনার পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ অভিযানের সময় গুলিতে নিহত মানুষের সংখ্যা অন্তত সাতজনে পৌঁছেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং নির্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশজুড়ে আইসের অভিযান আরো বেড়েছে। রয়টার্সের হাতে আসা আইসের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে মেইনে সংস্থাটির গ্রেপ্তারের সংখ্যা চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে মেইনে আইস প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করছিল, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সোমবার মেইনে আইস কর্মকর্তাদের গুলিতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সরকারি তথ্য খুবই সীমিত ছিল। ফলে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া পরোক্ষ তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই ঘটনার কিছু বিবরণ প্রকাশ করেন। মেইনের মার্কিন সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক কর্মকর্তা তাকে বলেছেন, গুলিতে নিহত ব্যক্তি বিশোর্ধ্ব এক যুবক ছিলেন। তিনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তার গাড়িকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করেছিলেন।

প্রাথমিকভাবে কিংকে জানানো হয়েছিল, ওই ব্যক্তি তার অভিবাসন অবস্থার কারণে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আওতায় ছিলেন। তবে পরে নতুন তথ্য দিয়ে জানানো হয়, নিহত ব্যক্তি আসলে সেই পরোয়ানার লক্ষ্য ছিলেন না। সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং বলেন, তদন্তের মূল বিষয় হওয়া উচিত নিহত ব্যক্তি আইস কর্মকর্তাদের জন্য সত্যিই কোনো গুরুতর হুমকি তৈরি করেছিলেন কি না, যার কারণে গুলি চালানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তির অভিবাসন অবস্থার চেয়ে গুলি চালানোর কারণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখাই তদন্তের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

বিডেফোর্ড শহরের বাসিন্দা ৭১ বছর বয়সী ড্যানিয়েল বুশার জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি তার অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। এ সময় তিনি পটকা ফাটার মতো কয়েকটি শব্দ শুনতে পান।
জানালার কাছে গিয়ে তিনি দেখেন, একটি সাদা এসইউভি একটি ছোট সাদা গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছে। পরে রাস্তায় নেমে এসে তিনি কাছ থেকে দেখেন, এসইউভি থেকে বেরিয়ে আসা একজন আইস কর্মকর্তা গাড়ির দরজা খুলে চালককে টেনে বের করছেন। তখন চালকের মুখ ও মাথা রক্তাক্ত ছিল।

বুশারের দাবি, তিনি আহত ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, ‘আমি তো গাড়ি থামানোর চেষ্টা করেছিলাম।’ এর কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বলে তার মনে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা কর্মকর্তাদের একজনকে খুবই বিচলিত ও হতবাক মনে হচ্ছিল।

এদিকে রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা গাড়িটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছিল এবং ভেস্ট পরা দুজন ব্যক্তি হেঁটে গিয়ে সেটি থামানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে ভিডিওটি গুলি চালানোর আগে নাকি পরে ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রয়টার্সের তোলা একটি ছবিতে দেখা গেছে, ঘটনায় জড়িত সাদা গাড়িটির চালকের পাশের উইন্ডশিল্ডে চারটি গুলির ছিদ্রের মতো চিহ্ন রয়েছে। গাড়িটি পরে একটি টো ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার পর বিডেফোর্ডে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে একটি পার্ক থেকে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের কার্যালয় পর্যন্ত মিছিল করেন। তিনি এ বছর পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

একপর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ভবনের প্রবেশপথে ঢুকে ‘আইস বের হয়ে যাও’ এবং ‘তাকে ভোট দিয়ে সরাও’ স্লোগান দেন। তবে কোনো সহিংসতা বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেনি। সোমবার সন্ধ্যায় প্রায় ২০০ জন বিক্ষোভকারী শহরে মিছিল করেন। তারা ‘মেইন থেকে আইস দূর হও’ স্লোগান দেন এবং পরে একটি পার্কে মোমবাতি প্রজ্বালন করে অভিবাসীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

এই ঘটনা ঘটে টেক্সাসের হিউস্টনে আইস অভিযানে ৫২ বছর বয়সী লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজো নিহত হওয়ার ছয় দিন পর। আইস জানিয়েছিল, সেটিও ছিল একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিবাসন অভিযান। সংস্থাটির দাবি, সালগাদো তার ভ্যান দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একটি গাড়িতে ধাক্কা দেন এবং এক কর্মকর্তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর ওই কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান।

তবে আইস তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। সমালোচকরা বলছেন, অতীতেও আইস ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কিছু প্রাথমিক বিবৃতি পরে ভিডিও ফুটেজ বা অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আদালতেও তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

LEAVE A REPLY