সংগৃহীত ছবি
শহরের এক ব্যবসায়ী সমুদ্র দেখতে গেছেন। গিয়ে দেখেন এক জেলে মাছ ধরা বাদ দিয়ে নৌকায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে।ব্যবসায়ী জানতে চাইলেন মাছ না ধরে শুয়ে আছো কেন? জবাবে জেলে বলল, তার যতটুকু দরকার, ততটুকু মাছ ধরা হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী বললেন, শুয়ে আরাম না করে আরো মাছ ধরলে তার আরো আয় হবে। জেলে বললেন, তারপর? ব্যবসায়ী এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বললেন, বেশি পরিশ্রম করলে, বেশি করে মাছ ধরলে তার আয় বাড়বে, উন্নতি হবে। তিনি বড় ব্যবসায়ী হতে পারবেন।জেলে বললেন, তারপর? ব্যবসায়ী বললেন, বড় ব্যবসায়ী হতে পারলে শেষ জীবনটা তিনি কোনো সমুদ্রের পাড়ে আয়েশ করে কাটাতে পারবেন। শুনে সেই জেলে আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বললেন, আমি তো এখনই তাই করছি। তাহলে আর এত কষ্ট করবো কেন?
অনেকেই এই জেলের জীবনদর্শন পছন্দ করেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আয় করতে গিয়ে জীবনের আরাম নষ্ট করতে চান না।আবার অনেকের মাথায় সেই ব্যবসায়ীর মতো ব্যবসায়িক বুদ্ধি আছে। সবাই যদি জেলের মতো নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে চান; তাহলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাবে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে না, কর্মসংস্থান হবে না। তবে কে কেমন জীবন চান, সেটা তার স্বাধীনতা। কেউ সেই জেলের মতো জীবন চাইবেন, কেউ সেই ব্যবসায়ীর মতো।
সাধারণভাবে মানুষ একটা ভালো একাডেমিক ক্যারিয়ার শেষে একটা ভালো চাকরি চায়।তারপর বিয়ে, সংসার, সন্তান, বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, পদ-পদবি- সাফল্যের মুকুটে যুক্ত করতে চায় একের পর এক পালক। আর এটা পেতে তাদেরকে সামিল হতে হয় প্রতিদিনের এক বিরামহীন ইঁদুর দৌড়ে। কিন্তু সবার সাফল্যের মাপকাঠি একইরকম নাও হাতে পারে। যেমন ৩৫ বছর বয়সী আশিষ জৈনের ভাবনাটাই ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা আশিষ জৈনের জীবনদর্শন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হচ্ছে ভারতে।
আশীষ জৈন তার পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি একজন ৩৫ বছর বয়সী মানুষ যার নিজের কোনো বাড়ি নেই, নিজের কোনো গাড়ি নেই, বড় কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, স্টক বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিশাল কোনো পোর্টফোলিও নেই এবং খুব বড় কোনো চাকরিও নেই। তবে আমি একটি মার্জিত ভাড়া বাড়িতে থাকি, উবারে যাতায়াত করার সামর্থ্য রাখি এবং আমার কোনো ঋণ নেই।’
আশিষ লিখেছেন, ‘গত বছরের তুলনায় আমার শরীর এখন অনেক ভালো, মানসিক দিক থেকেও গত বছরের চেয়ে ভালো আছি। এক বছর পর যেগুলোর কোনো গুরুত্ব থাকবে না, এমন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ নেওয়া বন্ধ করেছি। বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য নিজের ওপর জোর খাটানো বা চাপ দেওয়া বন্ধ করেছি। ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছি। নিজের শরীর ও মনের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করেছি।’
ভালো থাকার রহস্যটা জানিয়েছেন, ‘এখন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছি, এবং জাঙ্ক ফুড খাওয়া বন্ধ করেছি বা কমিয়ে দিয়েছি।’ আশিষ লিখেছেন, ‘আপনার জীবনের সবকিছু গুছিয়ে বা হিসেব করে চলতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। এটা ঠিক আছে, শুধু প্রতিটি দিন যেভাবে আসে সেভাবেই যাপন করুন, নিজের দিকে মনোযোগ দিন।
রবিবার এক্স (সাবেক টু্ইটার)এ আশিষ জৈন তার জীবন দর্শন শেয়ার করার পর রীতিমত ভাইরাল সেটি, ৮৬ হাজারেরও বেশি মানুষ দেখেছেন। অধিকাংশ মানুষই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই তার নিজের মতো করে জীবনযাপন করার ইচ্ছাকে সম্মান করেছেন।
একজন মন্তব্য করেছেন, ‘কথাটি বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমিও একই নৌকার যাত্রী। মাঝে মাঝে আমার চারপাশের পরিবেশ আমাকে কিছুটা মানসিক চাপে ফেলে দেয়। তারপর আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে, আমি কেবল নিজের নিয়মগুলো মেনে চলার মাধ্যমেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আপনি বাইরের অনেক মানুষের চেয়ে ভালো আছেন। ৩৫ বছর বয়সে আপনার দেরি হয়ে যায়নি; আপনি কেবল শুরু করছেন। কোনো এক কারণে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে ৩০ বছরের আগেই জীবনকে গুছিয়ে ফেলতে হবে, হয়তো এই কারণে যে আমরা যখন বিশের কোঠায় থাকি, তখন ৩০ বছর বয়সকে অনেক বেশি মনে হয়। কিন্তু আসলে তা নয়।’
একজন এটিকে ‘জীবনযাপনের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়’ অভিহিত করে লিখেছেন, ‘জীবন হলো আপনার সঙ্গে আপনার লড়াই, কারো ইনস্টাগ্রাম লাইফস্টাইলের সঙ্গে নিজের তুলনা করা নয়।’
ঋণমুক্ত জীবন, সুস্থ শরীর ও প্রশান্ত মনকেই প্রকৃত সাফল্য হিসেবে বর্ণনা আরেক মন্তব্যকারী এটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আশিষকে ধন্যবাদ জানান। আরেকজন লিখেছেন, ‘একটি বাঁধাধরা চেকলিস্টের পেছনে দৌড়ানোর চেয়ে প্রতিদিন আমরা যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তার ওপর ফোকাস করা অনেক বেশি কার্যকরী। এভাবেই এগিয়ে যান।’
আরেকজন সাফল্যকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, ‘সাফল্য শুধু আপনার কী আছে তা নয়। এটি হলো আপনার ভেতরের শান্তি, স্বাস্থ্য এবং বিকাশ; যা আপনি নিজে গড়ে তুলেছেন।’ আরেকজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, ‘ঋণমুক্ত থাকার গুরুত্ব মানুষ যতটুকু বোঝে, এটি আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি প্রশংসার যোগ্য।’
অপর মন্তব্যকারী জীবনের হিসাব মিলিয়ে দিয়েছেন, ‘শূন্য ঋণ, আগামীকালের জন্য শূন্য চাপ, ধূমপান বর্জন, তুলনার খেলা থেকে মুক্তি। আমার চেনা বেশিরভাগ ৩৫ বছর বয়সীদের চেয়ে এটি অনেক শক্তিশালী একটি ব্যালেন্স শিট। সাবাশ, আশীষ!’










































