ছবি : এইচইউআর
সম্প্রতি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জবাবে রাশিয়া ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে। মস্কোর এসব অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।তাতে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলেনেস্কির প্রশাসন। এতে বেড়েই চলেছে প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি। এরই মাঝে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য দিয়েছে ইউক্রেনের প্রধান সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এইচইউআর)। সংস্থাটির দাবি, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে চলেছে।তাই সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে না।
ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম কিয়েভ পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এইচইউআর তথ্য অনুযায়ী, মস্কো এপ্রিল, মে এবং জুনে ৩০২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
এনিয়ে আরবিসি-ইউক্রেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তরের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিতস্কি বলেছেন, রেকর্ড পরিমাণ ব্যালিস্টিক হামলা সত্ত্বেও রাশিয়া ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করবে না। কারণ মস্কো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে চলেছে।সেই সঙ্গে আরো কার্যকর বলে বিবেচিত অস্ত্রের পরীক্ষাও অব্যাহত রেখেছে।
রাশিয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমাতে পারে, কিন্তু হামলা বন্ধ করার সম্ভাবনা কম বলে যোগ করেন এই সামরিক গোয়েন্দা উপপ্রধান।
এর আগে কিয়েভ পোস্টের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে রেকর্ড সংখ্যক ৩৭৭টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এই সংখ্যার মধ্যে ইস্কান্দার এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এস৪০০ সিস্টেম থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্র এবং জিরকন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এদিকে রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র ৩৬টি প্রতিহত বা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল—যা প্রায় ২৯ শতাংশ।এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রতি চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিপরীতে প্রায় তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতারই প্রতিফলন।
রাশিয়া চলতি মাসে ১৫৩টি খ-১০১, কালিব্র এবং খ-৩২ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে এইচইউআরের উপপ্রধান বলেন, ‘আপনাদের মনে আছে, আগে তারা প্রতি ১০ দিনে একবার হামলা চালাত। এরপর তা সপ্তাহে একবার হয়েছিল। আর এখন এই হামলার ঘটনা ঘটছে আরো ঘনঘন হচ্ছে।’
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, রাশিয়া তাদের বেশ কয়েকটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
স্কিবিটস্কির তথ্য অনুযায়ী, মস্কো বর্তমানে তাদের মূল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নির্ধারিত মাসিক পরিকল্পনার চেয়ে ১১০শতাংশ থেকে ১২০শতাংশ বেশি উৎপাদন করছে। এমনকি চলতি বছরের ৩ আগস্টের মধ্যেই তারা জিরকন এবং আধুনিকায়িত ওনিক্স ক্ষেপণাস্ত্রের বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলেছে। মাত্র সাত মাসে রাশিয়া ৩৩টি জিরকন এবং ৬০টি ওনিক্স ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। মস্কো এখন নির্দিষ্ট কিছু কার্যকর অস্ত্রের উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং সেদিকেই সমস্ত অর্থ খরচ করছে।
কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে রাশিয়া তাদের সামরিক সম্পদের পুনর্বিন্যাস করছে। স্কিবিটস্কি জানান, গত এপ্রিল মাস থেকে কিনঝাল এবং খ৩২ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। রাশিয়া মূলত খ৩২ ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরীক্ষামূলক ইউক্রেনে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে ব্যর্থ হয়। রুশ বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে পুনরায় উন্নয়নের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে এবং উৎপাদন পরিকল্পনা স্থগিত করেছে।
একইভাবে কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা নিয়েও সংকটে পড়েছে মস্কো। স্কিবিটস্কি বলেন, ‘একটি কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ব্যবধান ৫-৭ মিটারের বেশি হওয়া উচিত নয়, অথচ তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৩০ মিটার বা তারও বেশি। ফলে কিনঝাল এবং খ-৩২ প্রোগ্রামে বরাদ্দকৃত তহবিল অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রাশিয়া তাদের ড্রোন উৎপাদনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। চলতি আগস্ট মাসে মস্কো প্রায় ১১হাজার অ্যাটাক ইউএভি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এখন তাদের মূল ফোকাস টার্বোজেট ইঞ্জিনচালিত ‘গেরান-৪’ এবং ‘গেরান-৫’ ড্রোনের দিকে।
সাম্প্রতিক একটি রুশ হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলোর প্রায় অর্ধেকই ছিল এই টার্বোজেট চালিত ইউএভি।
স্কিবিটস্কি আরো বলেন, ‘সাম্প্রতিক একটি হামলায় ৫০শতাংশ ড্রোনই ছিল টার্বোজেট চালিত।’
এই দ্রুতগতির ড্রোনগুলো প্রতিহত করার জন্য ভিন্ন ধরনের ইন্টারসেপ্টর বা স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হওয়ায় ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতেও রাশিয়া নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইলন মাস্কের স্টারলিংকের বিকল্প হিসেবে রাশিয়া ‘রাসভিয়েত’ নামে নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন দ্রুততর করছে।
গত মার্চ মাসে তারা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৬টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ২৯২টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯২৪টি স্যাটেলাইটের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক বা কনস্টেলেশন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বর্তমানে এই ব্যবস্থাটি ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের ওপর মাঝে মাঝে কাজ করলেও, এটি পুরোপুরি চালু হলে তা স্টারলিংকের মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সতর্ক করেছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার মতে, রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলাগুলো মূলত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর, রেলপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সহায়তাকারী জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।
এইচইউআরের তথ্য অনুযায়ী, মস্কো আগামী শরৎ ও শীতকালীন অভিযানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় মজুদ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর অর্থ হলো, রাশিয়া যদি একক কোনো হামলায় অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে দেয়, তাহলেও ইউক্রেনকে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক ও অবিরাম হামলার মুখোমুখি হতে হতে পারে।









































