সংগৃহীত ছবি
ভারতে যৌন নিপীড়নের মামলায় ভুক্তভোগীর আচরণ বা ব্যক্তিগত জীবনকে বিচার করার দীর্ঘদিনের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর পেছনে কারণ, সাংবাদিক ও তেহেলকার সাবেক সম্পাদক তারুণ তেজপালের বহুল আলোচিত যৌন নিপীড়ন মামলায় বোম্বে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়।
আদালত বলেছেন, কোনো যৌন নিপীড়নের অভিযোগকারীর বক্তব্য শুধু এ কারণে অবিশ্বাস করা যাবে না যে তিনি ঘটনার পর তথাকথিত ‘আদর্শ ভুক্তভোগীর’ মতো আচরণ করেননি। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
২০১৩ সালে তেহেলকা সাময়িকীর এক নারী সহকর্মী তারুণ তেজপালের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন।অভিযোগের পর তেজপাল সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ঘটনাটি ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২১ সালে গোয়ার একটি ট্রায়াল কোর্ট তাকে খালাস দেন। আদালত সে সময় অভিযোগকারীর বক্তব্যে অসংগতি, ঘটনার পর তার আচরণ, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেয়।
তবে গত সপ্তাহে বোম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ সেই রায় বাতিল করে তারুণ তেজপালকে দোষী সাব্যস্ত করেন।আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ট্রায়াল কোর্টের যুক্তিতে গুরুতর ত্রুটি ছিল এবং অভিযোগকারীর আচরণকে অযথা বিচার করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের জানান, যৌন নিপীড়নের মামলায় প্রায়ই ভুক্তভোগীকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করেননি, কেন পরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করেছেন, কেন অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন—এসব বিষয়কে অনেক সময় তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রেবেকা জন বলেন, মানুষ মানসিক আঘাতের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্নভাবে মানিয়ে নেন। তাই কোনো নির্দিষ্ট আচরণকে সত্য বা মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।তাঁর মতে, আদালতের উচিত প্রমাণ ও ঘটনার ভিত্তিতে বিচার করা, ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত জীবন বা আচরণকে নয়।
আইনজীবী বন্দনা শাহের মতে, কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা অনেক নারীর জন্য সহজ নয়। চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই অভিযোগ করতে দেরি করেন বা নীরব থাকেন।
তার মতে, কোনো নারী ঘটনার পর কাজে ফিরে গেছেন বা অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলেছেন—এটি তাঁর অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে না। অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির কারণে তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বোম্বে হাইকোর্টের এই রায় যৌন নিপীড়নের মামলায় বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। তবে একটি রায়ই পুরো বিচারব্যবস্থা বদলে দেবে—এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।
মামলাটি এখনো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল হতে পারে। তাই এই রায়ের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ভর করবে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।
তবু আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা , ভবিষ্যতে যৌন নিপীড়নের মামলায় আদালত ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত জীবন বা ঘটনার পর তাঁর আচরণের পরিবর্তে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ঘটনার বাস্তবতাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।









































