এআইয়ের প্রশিক্ষণের জন্য দুর্লভ বই ধ্বংস, উদ্বিগ্ন বই বিক্রেতারা

ছবি : রয়টার্স

‘কখনো কখনো বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়েও বই নিজেই আপনাকে বেশি কিছু বলে’, বলছিলেন টিম হোয়াইট। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলসন হলে মেলবোর্ন রেয়ার বুক ফেয়ারের জন্য নিজের স্টল সাজাচ্ছিলেন তিনি।অস্থায়ী তাকের ওপর প্লাস্টিকের আবরণে যত্ন করে রাখা মলাটবাঁধাই বই ও পুস্তিকা সাজিয়ে রাখছিলেন হোয়াইট।

টিম হোয়াইট ‘বুকস ফর কুকস’ নামে একটি স্বাধীন বইয়ের দোকান চালান। তার কাছে বই শুধু ভেতরের লেখা বা তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বইয়ের আকার, মলাট ও চেহারাও গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াইট বলেন, ‘খাবার ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে আমরা আগ্রহী।তাই আমরা বিভিন্ন ধরনের বই খুঁজি। এসব বই খাবার, সমাজ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে নানা দিক তুলে ধরে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্লভ বই বিক্রেতাদের বেশিরভাগই এভাবে কাজ করেন। আমরা এমন বই ও জিনিস নিয়ে কাজ করি, যেগুলোর পেছনে একটি গল্প রয়েছে।’

তবে বই বিক্রেতা ও দুর্লভ বইয়ের বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, জেনারেটিভ এআই কম্পানিগুলো এআই প্রশিক্ষণের জন্য পুরোনো ও মূল্যবান বই কিনে সেগুলো নষ্ট করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বইয়ের লেখকদের করা একটি কপিরাইট মামলা থেকেই এই উদ্বেগের শুরু। লেখকেরা এআই কম্পানি অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত আদালতের নথিতে জানা যায়, অ্যানথ্রোপিক ‘ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল।এ পদ্ধতিতে তারা বই কিনে বাঁধাই কেটে ফেলত। এরপর বইয়ের পাতাগুলো দ্রুত স্ক্যান করা হতো। স্ক্যান শেষ হলে বইয়ের বাকি অংশ ফেলে দেওয়া হতো। কম্পানিটি বিষয়টি গোপন রাখারও চেষ্টা করেছিল। তবে আদালত পরে রায় দেন, মার্কিন কপিরাইট আইনে এই কাজ বৈধ। আদালতের মতে, এটি ‘রূপান্তরমূলক ব্যবহার’-এর আওতায় পড়ে।

এখন জানা যাচ্ছে, জেনারেটিভ এআই কম্পানিগুলোর মধ্যে এভাবে বই সংগ্রহের প্রবণতা বেশ সাধারণ ঘটনা। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কাজ সহজ করতে মধ্যস্থতাকারীরাও যুক্ত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো বই বিক্রেতারাও এ নিয়ে চিন্তিত। তাদের প্রশ্ন, অজান্তেই তারা কি এআই কম্পানিগুলোর বই সংগ্রহের কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছেন? কারণ সম্প্রতি তারা এমন অনেক অর্ডার পাচ্ছেন, যা সাধারণ ক্রেতাদের আচরণের সঙ্গে মিলছে না।

একাধিক বই বিক্রেতা গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে জানান, তারা কানাডার জুম বুকস নামের একটি কম্পানির কাছ থেকে বইয়ের অর্ডার পেয়েছেন। কম্পানিটি নিজেদের বই পুনর্ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। অর্ডারগুলো সাধারণত অ্যাবেবুকস বা বিব্লিওর মতো বড় অনলাইন পুরনো বইয়ের বাজার থেকে আসত। এসব সাইটে সস্তা পেপারব্যাক বই থেকে শুরু করে দুর্লভ ও দামি বইও বিক্রি হয়।

ভিক্টোরিয়ার বেনাল্লায় ‘গুড রিডিং সেকেন্ডহ্যান্ড বুকস’-এর মালিক ডেলফিনা ম্যানর বলেন, মে মাসে তিনি জুম বুকসের কাছ থেকে একসঙ্গে তিন বাক্স বইয়ের অর্ডার পান। পরে তিনি কম্পানিটিকে অনুরোধ করেন, যেন ভবিষ্যতে এত বেশি বইয়ের অর্ডার না দেয়।

ম্যানর বলেন, ‘তারা অর্ডারের টাকা আগেই পরিশোধ করত এবং ডাক খরচ নিয়েও কোনো আপত্তি করত না। কিন্তু প্রতিবার প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বইয়ের অর্ডার আসত। এতগুলো বই খুঁজে বের করা, প্যাকেট করা এবং কোনো বই বাদ পড়েনি তা নিশ্চিত করা আমার জন্য খুবই ঝামেলার ছিল।’

মেলবোর্নের সেইন্সবেরিস বুকসের মালিক জন সেইন্সবেরিও জানান, একই সময়ে তার দোকানের অনলাইন তালিকা থেকে জুম বুকসের অনেক অর্ডার এসেছিল। তিনি বলেন, অর্ডারগুলো বইয়ের দামের ওপর নির্ভর করত না। কোন বই কেন অর্ডার করা হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট ছিল না। অর্ডারে বিশেষ ধরনের বই, নিম্নমানের বই এবং কয়েক দশক পুরোনো বইও ছিল। এসব বই পাঠাতে সেইন্সবেরিসকে বিদেশে বেশ কয়েকটি বাক্স পাঠাতে হয়েছে।

সেইন্সবেরি তার প্রতিষ্ঠানকে ‘পুরোনো বইমেলার একজন সাধারণ বই বিক্রেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ তার দোকানে শুধু দুর্লভ বা বিশেষ বই বিক্রি হয় না। একই ধরনের অর্ডার পাওয়া অন্য বিক্রেতারাও মূলত সাধারণ পুরোনো বই বিক্রি করেন। তবে দামি ও বিশেষায়িত দুর্লভ বই বিক্রেতাদের কাছে এ ধরনের অর্ডার গেছে বলে মনে হয় না।

কিছু বই বিক্রেতার ধারণা, জুম বুকস হয়তো কম দামে বই কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য এসব বই সংগ্রহ করছে। পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় এ ধরনের কেনাবেচা সাধারণ ঘটনা। তবে জুম বুকসের কিছু নির্দিষ্ট অর্ডার তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

একটি অর্ডারে ১৯৭০-এর দশকের মৃত্তিকা বলবিদ্যার একটি ম্যানুয়ালের সঙ্গে ছিল ২০১০ সালের ‘বর্ন টু থান্ডার: চ্যাম্পিয়নস অব নিউজিল্যান্ড সাইক্লিং’ বই, ১৯৮২ সালে প্রকাশিত অস্ট্রেলীয় কবিতার একটি সংকলন এবং মেলবোর্নের হথর্ন এলাকার ইতিহাস নিয়ে একটি বই। কবিতার বইটি মাত্র ৯ ডলারে বিক্রি হয়েছিল এবং প্রায় ২০ বছর ধরে দোকানের তাকেই পড়ে ছিল।

টিম হোয়াইট বলেন, এ ধরনের ঘটনা নিয়ে এক ধরনের ‘অদ্ভুত টানাপোড়েন’ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি এটি ২০ ডলারের একটি বই হয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় এর ৫ লাখ কপি থাকে, তাহলে বইটি নষ্ট হলেও আমি খুব বেশি কষ্ট পাব না। তবে কপিরাইট নিয়ে আমার আপত্তি থাকবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু বইটির মধ্যে যদি কোনো গল্প বা বিশেষ ঐতিহাসিক মূল্য থাকে, অথবা সেটি যদি একমাত্র কপি হয়, তাহলে বইটি নষ্ট হওয়া খুবই ভয়াবহ।’ তবে যেসব বই বিক্রেতার কাছে বিপুল পরিমাণ বই রয়েছে এবং সব বইয়ের তালিকা তৈরি করাই কঠিন, তাদের জন্য এ ধরনের বিক্রি সব সময় খারাপ নয়। নিক ডাওয়েস তার স্ত্রী জেনির সঙ্গে গ্রান্ট’স বুকশপ চালান। তার ধারণা, তাদের গুদামে প্রায় ৫ লাখ বই রয়েছে।

ডাওয়েস বলেন, ‘কেউ যদি এসে আমার সব বই কিনে নিয়ে সেগুলো কেটে টুকরো করে ফেলে, তাহলে একদিকে আমার খারাপ লাগবে, আবার অন্যদিকে খুশিও হব। কারণ এত বই একসঙ্গে বিক্রি করা সহজ নয়। কিন্তু কেউ যদি বলে, ‘এই বইটির আর কোনো কপি নেই, আমি এটিকে কেটে ফেলব’, তাহলে আমি বলব, বইটি আপনার কাছে না পাঠানোই ভালো।’

শুধু এআই কম্পানিই নয়, লাভের জন্য বই নষ্ট করার ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিছু বিক্রেতা দুর্লভ বই কিনে সেগুলো কেটে ফেলেন। পরে বইয়ের ভেতরের ছবি বা অলঙ্করণের পাতাগুলো আলাদাভাবে বিক্রি করেন। চ্যাটেলেইন বুকসের দুর্লভ বই বিক্রেতা গ্বেন্থ টড বলেন, ‘আমি কোনো বই বিক্রি করার পর যদি দেখি, সেটির ভেতরের ছবিগুলো আলাদাভাবে বিক্রি হচ্ছে, তাহলে বিষয়টি আমার কাছে খুবই খারাপ লাগে।’

তাই তিনি ক্রেতাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেন, যাতে বইগুলো ‘ভুল হাতে’ না যায়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে বই শুধু একটি বস্তু নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু।’ অ্যানথ্রোপিকের এক মুখপাত্র বলেন, কম্পানিটি কখনো জুম বুকস থেকে বই কেনেনি। তবে তিনি জানান, এআই শিল্পে বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বই সংগ্রহ করা একটি প্রচলিত পদ্ধতি।

তিনি আরো বলেন, অ্যানথ্রোপিক সাধারণ বাণিজ্যিক বাজার থেকেই বই সংগ্রহ করে। তাদের কোনো বই সংগ্রহের কর্মসূচিতে দুর্লভ বা পুরোনো বই কিনে নষ্ট করা হয় না।

জুম বুকসের সহপ্রতিষ্ঠাতা মনরূপ গিল সম্প্রতি লিঙ্কডইনে এক পোস্টে জানান, গত কয়েক মাসে তাদের কম্পানি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর আগে জুম বুকস বই নষ্ট করে স্ক্যান করার অভিযোগও অস্বীকার করেছে। কম্পানিটির এক মুখপাত্র গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে বলেন, ‘আমরা পুরোনো বই সংগ্রহ করি এবং সেগুলো অক্ষত অবস্থায় আবার বিক্রি করি। আমরা বই ডিজিটাল করি না। আমাদের প্রধান লক্ষ্য বই পুনরায় ব্যবহার করা। কোনো বই আর ব্যবহার বা বিক্রি করা সম্ভব না হলে আমরা সেটি দায়িত্বশীলভাবে পুনর্ব্যবহার করি।’

তবে জুম বুকস এআই কম্পানিগুলোর কাছে বই নষ্ট করে স্ক্যান করার জন্য অক্ষত বই বিক্রি করেছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি। কম্পানিটি বলেছে, ‘আমাদের ব্যবসায়িক চুক্তিতে গোপনীয়তা রক্ষার শর্ত রয়েছে। তাই আমরা আমাদের গ্রাহকদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ বা আলোচনা করতে পারি না।’

LEAVE A REPLY