ডিজিটাল যুগে শর্টকার্টে তারকা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ

একসময় তারকা হতে হলে বছরের পর বছর সাধনা, প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যমের স্বীকৃতি প্রয়োজন হতো। এখন একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ৩০ সেকেন্ডের একটি ভাইরাল ভিডিওই বদলে দিতে পারে একজন সাধারণ মানুষের পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা ডিজিটাল যুগে তারকা হওয়ার পথকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা প্রশ্নও। ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা, ভুয়া তথ্য, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে এই ‘শর্টকাট’ আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক কনটেন্ট নির্মাতাদের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বিবিএস-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুকের বিজ্ঞাপনভিত্তিক সম্ভাব্য ব্যবহারকারী প্রায় ৬ কোটি এবং ইউটিউবের প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ। একই সময়ে দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিশাল ব্যবহারকারী ভিত্তিই তৈরি করেছে ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’। অল্প সময়ে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকায় অনেক তরুণ-তরুণী কনটেন্ট নির্মাণকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। ব্র্যান্ড প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে অনেকেই উল্লেখযোগ্য আয়ও করছেন।

প্রসঙ্গক্রমে সেন্টার ফর টেকনোলজি জার্নালিজমের (সিটিজে) সভাপতি হাসান জাকির বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে অ্যালগরিদমনির্ভর জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেকেই মানসম্মত কনটেন্টের বদলে চমকনির্ভর বা বিতর্কিত বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন। ফলে জনপ্রিয়তা আর গুণগত মান সব সময় সমার্থক হয়ে উঠছে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল তারকাখ্যাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গণতান্ত্রিক সুযোগ। আগে টেলিভিশন, সিনেমা বা সংবাদমাধ্যমের অনুমোদন ছাড়া পরিচিতি পাওয়া কঠিন ছিল। এখন গ্রামের একজন তরুণও নিজের প্রতিভা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন। রান্না, কৃষি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংগীত কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সফলতার নজির গড়েছেন।

তবে এর বিপরীত চিত্রও কম নয়। ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট, অশ্লীলতা, ভুয়া তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিতর্ক তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। অনেক কনটেন্ট নির্মাতা দর্শক টানতে সংবেদনশীল বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করছেন। এতে সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিজিটাল তারকাখ্যাতির সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্কও গভীর। লাইক, শেয়ার ও ফলোয়ারের সংখ্যা কমে গেলে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা হতাশা, উদ্বেগ কিংবা আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগেন। আবার নেতিবাচক মন্তব্য ও অনলাইন হয়রানি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহসানউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বীকৃতিনির্ভর মানসিকতা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও আত্মমূল্যায়নের সংকট তৈরি করতে পারে। তাই জনপ্রিয়তাকে জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসাবে না দেখে বাস্তব দক্ষতা ও ব্যক্তিগত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সাইবার বুলিং, পরিচয় চুরি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং অনলাইন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেক কনটেন্ট নির্মাতা। বিশেষ করে নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও হয়রানির ঘটনা বেশি আলোচিত হয়। ফলে ডিজিটাল তারকা হওয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে, যা বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এমন কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। ফলে অনেক সময় শিক্ষামূলক বা গঠনমূলক কনটেন্টের তুলনায় বিতর্কিত ভিডিও বেশি ভাইরাল হয়। এ প্রবণতা নির্মাতাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে, যাতে তারা নিয়মিত আলোচনায় থাকতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করেন।

অন্যদিকে, ইতিবাচক ব্যবহারের উদাহরণও অসংখ্য। দেশের অনেক চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা এবং সংস্কৃতিকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করছেন। তাদের উদ্যোগ লাখো মানুষকে তথ্যসমৃদ্ধ করছে এবং নতুন দক্ষতা অর্জনে উৎসাহ দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে তারকা হওয়ার শর্টকাট নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য, নৈতিকতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সংস্কৃতির ওপর। যদি জনপ্রিয়তা জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে এটি আশীর্বাদ। কিন্তু যদি তা শুধুই ক্ষণস্থায়ী ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি ব্যক্তি ও সমাজ-উভয়ের জন্যই অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে।

ডিজিটাল যুগে তাই প্রয়োজন শুধু তারকা হওয়ার স্বপ্ন নয়, দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হয়ে ওঠার মানসিকতা। কারণ ভাইরাল হওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্মান অর্জন এখনো দীর্ঘ পথেরই নাম।

LEAVE A REPLY