ছবি: এআই জেনারেটেড
অবসর মানেই জীবন থেমে যাওয়া একসময় এমনটাই ভাবা হতো। সকালে হাঁটা, বিকেলে টেলিভিশন দেখা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোই যেন অবসর জীবনের চেনা ছবি।কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ৬০ বা ৭০ পেরিয়েও অনেকে খুঁজে নিচ্ছেন নতুন বন্ধু, নতুন শখ এবং নতুন সামাজিক পরিসর।
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
ভারতে প্রবীণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এমন কিছু সামাজিক আয়োজন, যেখানে বয়স কোনো বাধা নয়।সাপার ক্লাব, নাচের অনুষ্ঠান, পিকলবল, গেম নাইট, ভ্রমণ কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন—এসবের মাধ্যমেই তৈরি হচ্ছে নতুন বন্ধুত্বের বন্ধন।
পরিবার নয়, নিজের পছন্দের মানুষও হতে পারে আপনজন
অবসরের পর অনেকেরই কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হয়। সন্তানরা পড়াশোনা বা চাকরির কারণে অন্য শহর কিংবা দেশে চলে যান। ফলে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে সামাজিক পরিসর।
এই জায়গা থেকেই তৈরি হচ্ছে ‘থার্ড স্পেস’ বা তৃতীয় পরিসর। বাড়ি হলো প্রথম পরিসর, কর্মক্ষেত্র দ্বিতীয়। এর বাইরে এমন জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় অন্যদের সঙ্গে দেখা করেন, আড্ডা দেন এবং নতুন কিছু করেন—সেটিই তৃতীয় পরিসর।
ভারতে এখন ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বিভিন্ন সংগঠন এমন আয়োজন করছে। সেখানে গেম নাইট, নাচ, খেলাধুলা, ভ্রমণ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
পিকলবল থেকে নাচ, সবখানেই নতুন বন্ধুত্ব
৭০ বছর বয়সী সুধা সিং অবসরের পর এমন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। নিয়মিত রান ক্লাবে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নাচের অনুষ্ঠানেও যোগ দেন তিনি।
তার অভিজ্ঞতা, অবসর জীবন যে এতটা প্রাণবন্ত হতে পারে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানো তার জীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
পিকলবল কোর্টেও তৈরি হচ্ছে এমন বন্ধুত্ব। অনেকেই আগে কখনো খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু নতুন বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে উপভোগ করছেন সময়।
শুধু খেলাধুলা নয়, গেম নাইট কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাড়ছে অংশগ্রহণ। কেউ কেউ অনুষ্ঠানে পরিচিত হওয়ার পর ফোন নম্বর বিনিময় করছেন। পরে নিজেরাই দেখা করার পরিকল্পনা করছেন।
অবসরের পর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সঙ্গ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসরের পর শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যসেবাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বন্ধুত্ব, মানসিক সংযোগ, ভ্রমণ, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ।
ভারতের সিনিয়রদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মজীবন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সামাজিক জীবনও অনেকটা বদলে যায়। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সন্তানরাও অনেক সময় দূরে চলে যান।
ফলে তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা।
এই শূন্যতা পূরণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নতুন সামাজিক কমিউনিটি।
বাড়ছে প্রবীণদের সংখ্যা
ভারতে দ্রুত বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৩ সালের ভারতীয় বার্ধক্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি হতে পারে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা।
অন্যদিকে, পরিবারও আগের মতো বড় থাকছে না। সন্তানরা চাকরি বা পড়াশোনার জন্য অন্য শহর কিংবা দেশে চলে যাচ্ছেন। অনেক পরিবারে বাবা-মা ও সন্তান একই বাড়িতে থাকলেও প্রত্যেকের জীবনযাপন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সামাজিক পরিসর তৈরি করার প্রয়োজনও বাড়ছে।
‘বৃদ্ধ বয়স’ মানেই ঘরে বসে থাকা নয়
৭৬ বছর বয়সী মেহবুব জি-এর অভিজ্ঞতাই এর উদাহরণ। স্ত্রীকে হারানোর পর তিনি একাকিত্বে ভুগছিলেন। পরে এমন একটি কমিউনিটিতে যুক্ত হন। সেখানে নতুন বন্ধু পেয়েছেন, ভ্রমণে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।
তার ভাষায়, আগে তিনি খুব একা ছিলেন। এখন আর একা নন। নতুন বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ করাই তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বয়স বাড়লেও মানুষের বন্ধুত্বের প্রয়োজন কমে যায় না। বরং অনেক সময় নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বদলাচ্ছে অবসর জীবনের ধারণা
আগের প্রজন্ম অবসরের পর সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দিত। সন্তানদের জন্য কিছু রেখে যাওয়াই ছিল বড় লক্ষ্য। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
অনেকেই এখন জীবিত অবস্থাতেই অর্থ খরচ করতে চান। ভ্রমণ, শখ, নতুন অভিজ্ঞতা এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ দিক থেকে দেখলে, ৬০ বা ৭০ পেরোনো মানুষদের জীবনযাপন অনেকটাই তরুণ প্রজন্মের মতো হয়ে উঠছে। নতুন বন্ধু তৈরি করা, নতুন জায়গায় যাওয়া এবং নিজের পছন্দের কাজ করা—সবই যেন বয়সের সীমা ভেঙে দিচ্ছে।
একাকিত্বের বিরুদ্ধে নতুন সামাজিক জীবন
আধুনিক জীবনে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সময় অনলাইনে কাটালেও মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ কমছে। এমনকি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মানুষের দৈনিক কথাবলার পরিমাণ কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
এই বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য সামাজিক কমিউনিটিগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
কারণ এসব আয়োজন শুধু বিনোদনের সুযোগ তৈরি করছে না। মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনছে, নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে এবং জীবনে আবারও একটি সামাজিক ছন্দ ফিরিয়ে দিচ্ছে।
বয়স তাই এখানে শেষ অধ্যায় নয়। বরং ৬০ পেরিয়েও শুরু হতে পারে জীবনের একেবারে নতুন অধ্যায়—নতুন বন্ধু, নতুন অভিজ্ঞতা আর নিজের মতো করে বাঁচার গল্প।









































