জার্মানিতে জয় ইউরোপের বাকি দেশগুলোতেও ক্ষমতায় যাচ্ছে কট্টর ডানপন্থীরা?

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। এ ফলকে শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে দেখছেন না ইউরোপের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।তাদের আশঙ্কা, জার্মানির এই ফল আগামী বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরির পথ দেখাতে পারে।

রবিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের মধ্য-ডানপন্থী দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নকে (সিডিইউ) বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে এএফডি। যদিও দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে। ফলে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও সরকার গঠনের সুযোগ নাও পেতে পারে দলটি।এএফডির সঙ্গে জোট সরকারে যেতে আগ্রহী নয় অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। দলটির কয়েকজন নেতার নাৎসি স্লোগান ব্যবহারের ঘটনা এবং হলোকাস্টের গুরুত্ব ছোট করে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাও দলটিকে সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিবাসী পরিবারের জার্মান নাগরিকদের নিয়েও দলটির অবস্থান বিতর্ক তৈরি করেছে।

কুমিল্লায় মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের বাস খাদে, আহত ২০

তারপরও নির্বাচনে এএফডির এই সাফল্য জার্মানির জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ দলটির ভোট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎসের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তার নেতৃত্বাধীন সিডিইউ এএফডির তুলনায় অর্ধেকেরও কম ভোট পেলে দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেৎসের অবস্থান এমনিতেই আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখন প্রকাশ্যেই তার নেতৃত্ব টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সময়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে জার্মানির প্রভাবও কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক মুজতবা রহমানের মতে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলো বর্তমানে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় অকার্যকারিতার সংকটে রয়েছে। সরকারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর সুযোগ নিচ্ছে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো। তিনি বলেন, কোনো দেশের সরকার যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকে, তখন ইউরোপের বৃহত্তর সমস্যা মোকাবিলায় সেই দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়। জার্মানির নির্বাচনী ফল এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে সামনে রেখে এসব দল ভোটারদের সমর্থন আদায় করছে।

বাড়ল নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে এএফডির অবস্থানের বেশ কিছু মিল রয়েছে। এসব দেশের ভোটারদের মধ্যেও অর্থনীতি ও সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। আগামী বছর ইউরোপের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে নির্বাচন হওয়ার কথা। ফ্রান্সে বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্পেনে আগামী আগস্টের মধ্যে এবং ইতালিতে বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তিন দেশেই কট্টর ডানপন্থী দল ও নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যা, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটের জন্য অনেক ভোটার বর্তমান সরকার ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করছেন। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা দলগুলোর জন্য জনসমর্থন তৈরির সুযোগ বাড়ছে।

এএফডির জয় ইউরোপের রাজনীতিতে আরেকটি পুরোনো বিতর্ককে সামনে এনেছে। এক পক্ষ মনে করে, কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি। অন্য পক্ষের দাবি, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রতিনিধিত্ব করছে এসব দল। সমালোচকদের আশঙ্কা, কট্টর ডানপন্থীরা ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে অভিবাসী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থকেরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে তারাই সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রচলিত দলগুলো জাতীয় পরিচয় ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

প্রত্যাবর্তনের অবিশ্বাস্য গল্প লিখে কোয়ার্টার ফাইনালে ঝেং

জার্মানির পর ইউরোপের রাজনৈতিক নজর এখন ফ্রান্সের দিকে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ আগামী বসন্তে দায়িত্ব ছাড়ার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালির নেতা মারিন লে পেন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। প্রথম দফার জনমত জরিপগুলোতে লে পেন উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি দ্বিতীয় দফার জরিপেও তার অবস্থান ছিল শক্তিশালী। গত ১৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসা লে পেন এবার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ক্ষমতার কাছাকাছি রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীরা সরকার গঠন করলে এর প্রভাব শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এর অন্যতম কারণ ফ্রান্সের কৌশলগত গুরুত্ব। দেশটি ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি, পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়া মূলধারার দলগুলোর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকেও বদলে দিতে পারে। এত দিন ফ্রান্স ও জার্মানির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কট্টর ডানপন্থীদের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। এই নীতিকে ফরাসি রাজনীতিতে ‘কর্দোঁ সানিতের’ বা রাজনৈতিক বাধার প্রাচীর হিসেবে দেখা হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফরাসি ও ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক ফিলিপ মারলিয়ের মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী যে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল, তা বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে এএফডির সাফল্য সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY