সেউতায় অভিবাসী ঢলের আগেই সতর্ক করেছিলেন স্পেনের গোয়েন্দারা

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসী প্রবেশের এক দিন আগেই সতর্ক করেছিল দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিবাসীদের একসঙ্গে সেউতায় প্রবেশের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে—এমন তথ্য পেয়েছিলেন গোয়েন্দারা।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, সম্প্রতি প্রকাশ করা স্পেন সরকারের গোপনীয় নথিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অভিবাসীদের ঢল সামলাতে সরকার পুরো পরিস্থিতি আগে থেকে জানতে পারেনি—প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের এমন বক্তব্য নিয়ে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তখন এসব নথি প্রকাশ করা হলো। ২৯ জুলাই স্পেনের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মরক্কোর কর্তৃপক্ষ এবং সেউতার প্রশাসনকে জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কয়েকটি গ্রুপে অভিবাসীদের পরদিন সেউতায় প্রবেশের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাটি বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের কয়েকটি গ্রুপের কথা উল্লেখ করে।এসব গ্রুপে বলা হচ্ছিল, অভিবাসীরা সাঁতরে এবং সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় প্রবেশ করবে। গোয়েন্দাদের হিসাবে, এসব বার্তা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দেখতে পাচ্ছিলেন। একটি বার্তায় বলা হয়, ৩০ জুলাই রাত ৮টা হবে সীমান্ত পার হওয়ার শেষ সুযোগ। কারণ সেদিন সেউতায় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কুচকাওয়াজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। 

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শুধু মরক্কোর কর্তৃপক্ষকেই নয়, সেউতায় স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর এবং সিভিল গার্ডকেও এ বিষয়ে সতর্ক করেছিল। খুদে বার্তার মাধ্যমেও তাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই তৎপরতার তথ্য পাঠানো হয়। এর পরদিন, ৩০ জুলাই, বিপুলসংখ্যক অভিবাসী মরক্কো থেকে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করে। ৩০ ও ৩১ জুলাই অন্তত ৭২ হাজার অভিবাসী সেউতায় ঢুকে পড়ে বলে শহরটির মেয়র জানিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই সীমান্তের বেড়া এড়িয়ে সাঁতরে সেউতায় প্রবেশ করে।এ সময় অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়।

সেউতা স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ছোট শহর। এটি উত্তর আফ্রিকায় মরক্কোর সীমান্তের পাশে অবস্থিত। ইউরোপে প্রবেশের পথ হিসেবে শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। পরে বেশির ভাগ অভিবাসী মরক্কোয় ফিরে গেলেও সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার মানুষ এখনো অস্থায়ী শিবিরে অবস্থান করছে। অনেকে শহরের রাস্তায় ও সমুদ্রসৈকতে রাত কাটাচ্ছে। এতে সেউতায় উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কেউ কেউ অভিবাসীদের জন্য তৈরি আশ্রয়কেন্দ্র ভাঙচুর করেছে। আবার কিছু মানুষ অভিবাসীদের জন্য পাঠানো ত্রাণ ও সহায়তাও আটকে দিয়েছে।

সেউতায় অভিবাসীদের এই ঢলের ঘটনায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। সানচেজ শুরু থেকেই বলে আসছেন, ৩০ জুলাইয়ের এই ঘটনা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না। এর আগে পার্লামেন্টে তিনি বলেছিলেন, জুলাইয়ের শেষ দুই দিনে যে বড় ধরনের ‘সংকট’ তৈরি হতে যাচ্ছে, তার ভয়াবহতা বোঝানোর মতো কোনো তথ্য সরকারের কাছে ছিল না। তবে নতুন প্রকাশিত নথিতে দেখা যাচ্ছে, ঘটনার এক দিন আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের সেউতায় প্রবেশের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিল স্পেনের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এ কারণে বিরোধী দলগুলো বলছে, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে প্রকাশিত নথির তথ্যের মিল নেই।

রক্ষণশীল পিপলস পার্টির নেতা এস্টার মুনোজ বলেন, সরকারের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল। সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশ এবং ওই ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করেন তিনি। উগ্র ডানপন্থী দল ভক্সের হোর্হে বুসাদেও সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, নথিগুলো প্রমাণ করে সানচেজ সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও নিরাপত্তাবিষয়ক অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সরকার অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ মানতে নারাজ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গোয়েন্দাদের হাতে যে তথ্য ছিল, তা দিয়ে ৩০ জুলাইয়ের ঘটনার প্রকৃত ব্যাপকতা আগে থেকে বোঝা সম্ভব ছিল না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, ৩০ জুলাই যে মাত্রার ঘটনা ঘটেছিল, তা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল- এমন কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি অবগত নন। সরকারের একজন সূত্রও একই কথা বলেছেন। তার দাবি, প্রকাশিত নথিগুলোতে এমন কোনো তথ্য নেই, যা দেখে বোঝা যায় যে এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সরকারের হাতে থাকা তথ্য দিয়ে সংকটের প্রকৃত আকার অনুমান করা সম্ভব ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন। সরকারের যুক্তি হলো, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ও তাদের হাতে ছিল না। নথি প্রকাশের কিছুক্ষণ আগে সানচেজ একটি স্পেনীয় টেলিভিশনকে বলেন, এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর একসঙ্গে আসার ঘটনা প্রত্যাশিত ছিল না। ঘটনার এক দিন আগে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, সেটি নিয়েও এখন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সেউতায় স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি মিগেল আনহেল পেরেস ত্রিয়ানো বলেন, ২৯ জুলাই গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাগুলোকে সরাসরি সতর্কবার্তা বা গোয়েন্দা প্রতিবেদন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তার ভাষায়, এগুলো ছিল তথ্যের আদান-প্রদান। তবে প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ওই বার্তাগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিবাসীদের সেউতায় প্রবেশের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সরকার ঠিক কী ধরনের তথ্য পেয়েছিল এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সেউতায় অভিবাসীদের ব্যাপক প্রবেশের ঘটনায় মরক্কোর ভূমিকা নিয়েও স্পেনে বিতর্ক চলছে।

এর আগে ফাঁস হওয়া স্পেনের পুলিশের একটি প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় মরক্কোর পুলিশ জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলে আসছেন, অভিবাসীদের সেউতায় প্রবেশে মরক্কোর সরাসরি সহযোগিতার কোনো প্রমাণ নেই। সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় সরকারের প্রকাশ করা ৪০টির বেশি নিরাপত্তা নথির মধ্যে ২৯ জুলাইয়ের গোয়েন্দা বার্তাগুলোও রয়েছে। এসব নথি প্রকাশের মাধ্যমে সরকার ঘটনার আগে ও পরে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে আরো তথ্য সামনে এনেছে।

LEAVE A REPLY