অনেক দিন ধরেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর ছিল মাকিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তিনি দ্বীপটি কিনে নিতে চেয়েছিলেন।শেষ পর্যন্ত কিনতে না পারলেও তিনি এমন একটি চুক্তি করতে যাচ্ছেন, যাতে দ্বীপটির ওপর মাকিন নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ হবে। আর রাশিয়া ও চীনসহ ন্যাটোর বাইরের যেকোনো দেশের আধিপত্য রুখে দেবে।
কয়েক মাসের কূটনৈতিক চাপ, বাণিজ্য শুল্কের হুমকির মাধ্যমেই ট্রাম্প এ চুক্তি আদায় করতে পেরেছেন। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক যে চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রদান করবে এবং ওই অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি কার্যত নিষিদ্ধ করবে।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান যে এই চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চিরস্থায়ী অধিকার নিশ্চিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সেখানে সামরিক উপস্থিতি বা সংবেদনশীল বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ চুক্তি স্বাক্ষর হলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, বিমান উড্ডয়ন এবং ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকার পাবে।
বিবিসির বরাত দিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড যদি স্বাধীনতা লাভও করে, তবু এই চুক্তিটি কার্যকর থাকবে। ৮০ বছর বয়সী এই রিপাবলিকান নেতা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, কৌশলগত কারণে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন এবং কেবল যুক্তরাষ্ট্রই গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এই চুক্তিটি নিশ্চিত করে যে চীন ও রাশিয়া গ্রিনল্যান্ডে কোনো ঘাঁটি তৈরি করতে পারবে না, তারা গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠাতে পারবে না এবং সংবেদনশীল খাতগুলোতে তাদের বিনিয়োগ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ব্যবস্থা এতে রয়েছে।’
উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল যাতায়াতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে এই অঞ্চলের অবস্থান ভূমিকা রাখে।
এছাড়া গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজ উপাদানের বিশাল ও অক্ষত মজুদ রয়েছে, যা উন্নত কনজিউমার প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য। এর নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলে বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বাজারে চীনের বর্তমান একচ্ছত্র আধিপত্যকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারবে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে থাকায় এর মাটির নিচে থাকা বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ উপাদান সোনা, হীরা, তেল ও গ্যাসের সন্ধান মিলছে। এই খনিজ সম্পদের লোভেই বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর নজর এখন গ্রিনল্যান্ডের ওপর।
বর্তমানে চীন আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক কন্টেইনার শিপিং পরিষেবা চালু করায়, ট্রাম্প প্রশাসন সুনির্দিষ্টভাবে এই দ্বীপটিতে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা সংবেদনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা বন্ধ করতে স্থায়ী নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই চুক্তির মাধ্যমে সংবেদনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসায়, চীনের ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ার পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংএর আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরের ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্পের এই চুক্তির ঘোষণা বেইজিংকে একটি শক্ত বার্তা দেয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরতে পারে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন পরিষ্কার করেছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করা হয়নি। গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বহাল থাকবে এবং এটি কোনো মার্কিন দখলদারি বা মালিকানা বদল নয়।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, তিনি আনন্দিত যে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক রাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ভালো চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, এটি ন্যাটো এবং ইউরোপের জন্য ভালো। তিনি বলেন, ’এই চুক্তিটি ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।’
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তিটি তাদের অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।











































